1. azadzashim@gmail.com : বিডিবিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম :
  2. litonsaikat@gmail.com : neelsaikat :

স্মৃতির জনপদ ও দুটি মুজিবকোট

  • Update Time : মঙ্গলবার, ৭ মে, ২০১৯
  • ৮৫ Time View

।।মোহাম্মদ আলম চৌধুরী।।

মানুষের বয়স যতোই বাড়তে থাকে ততোই স্মৃতিকাতর হয়ে ওঠে। স্মৃতির পিছুটান বারবার মানুষকে শেকড়ের টানে নিয়ে যায় তার বেড়ে ওঠার বসতভূমিতে। নাগরিক জীবনের ষোলোকলায় পরিপূর্ণ বিলাস-বৈভবে ভরপুর ফ্লাটেও মন আনচান করে। গ্রামীণ সোঁদামাটির গন্ধ আর পরশ অনুভবের জন্যে মন ছটফট করে। এ-যন্ত্রণার কথা মাইকেল মধুসুদন দত্ত উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়ে লিখেছিলেন ‘কপোতাক্ষ নদ’ কবিতাটি।

আমার জন্মের আজান ধ্বণিত হয়েছিলো রামু উপজেলার মৌজা দারিয়ার দিঘি গ্রামে। একদিকে বাঁকখালী আর আরেকদিকে রেজুখালের নিরন্তর বয়ে চলা। সুন্দর গ্রাম আমার দারিয়ার দিঘি। ভৌগলিক সীমানা নির্ধারণের রাষ্ট্রীয় বিধি মোতাবেক গ্রামটি রামু উপজেলাধীন হলেও অন্যান্য সব বিষয়ে যোগাযোগ উখিয়ার সাথে।

রবিবার আর বুধবার মরিচ্যাপালং-এ হাট বসে। দারিয়ার দিঘি, থোয়াইঙ্গাকাটা, কালুয়াহলা, ধোয়াপালং, খুনিয়াপালং, গোয়ালিয়াপালং, গুরাইয়ারদ্বীপ থেকে দলে দলে লোক মরিচ্যা হাটে আসে। কেউ পণ্যবিক্রেতা, কেউ পণ্যক্রেতা আর কেউ ¯্রফে ঘোরাফেরা করার জন্য আসে। শেষোক্তজনের মধ্যে আমিও বেশকিছুকাল ছিলাম।

রামু-উখিয়ার সীমানা নির্ধারণকারী রেজুখালের ওপর লালব্রিজ পেরিয়েই মরিচ্যাপালং। নামকরণের ঠিকুজি আমার জানা নেই। কথিত ৩৬০ পালংয়ের মধ্যে মরিচ্যাপালং অন্যতম। আমার স্মৃতির জনপদ মরিচ্যপালং এর কিছু নির্বাচিত স্মৃতিরোমন্থন করার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে এখানে।

মরিচ্যাপালং হাট বেশ জমে ওঠে সকাল থেকেই বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের আনাগোনা শুরু হয়। বাজার শুধু প্রথাগত অর্থে পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের স্থান না হয়ে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়। বহু আত্মীয়-স্বজনের সাথেই বাজারে দেখা হয়। সামাজিক বিভিন্ন উৎসবাদির আলোচনাও কোনো সময় দোকানে বসে হাটের দিন সম্পন্ন হতো। বিশেষ করে বিয়ে-শাদী ও গ্রামীণ সালিশগুলো এভাবেই হতো।

মরিচ্যাপালং হাটের পানবাজার বেশ জমজমাট ছিলো। মসজিদ রোড় দিয়ে পুরনো খাসমহল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো পানের বাজার। গোয়ালিয়াপালং, হলদিয়াপালং, দারিয়ার দিঘি, বড়বিল আর কালারপাড়া থেকে আসতো বেশিরভাগ পান। পানচাষীরা ভোর থেকেই পান নিয়ে আসতো বিক্রির জন্য।

গোয়ালিয়াপালং, গুরাইয়ারদ্বীপ থেকেও দলে দলে মানুষ বাজারে আসা যাওয়া করতো। তখনও রাস্তা-ঘাট পাকা ছিলো না। পায়ে হেঁটে বহু মেহনত করে মরিচ্যাপালং হাটে আসা-যাওয়া করতে হতো। এখন ব্রিজ, টেক্সি আর টমটমের ব্যবহার যোগাযোগের কষ্ট লাঘব করে দিয়েছে। মানুষ এখন আর সময়ের প্রতি কিংবা বিশেষ দিনের প্রতি খেয়াল না রেখেই যখনই ইচ্ছে হয় মরিচ্যাপালং বাজারে চলে আসে।

আনজু সওদাগরের ধানের কলের সামনে যে বড় শিশুগাছটি ছিল সেটির ছায়ার নীচে কবিরাজী দাওয়াই বিক্রি করতেন বাদশামিয়া কবিরাজ। কী সুন্দর তাঁর কথার ঢং, বাচনভঙ্গি আর উপমা। মানুষ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে থাকতো তাঁর কথার জাদুশৈলীতে। রোগনির্ণয় ও নিরাময়ের যে বর্ণনা কৌশল তিনি বয়ান করতেন, তাতে উপস্থিত রোগীর মুখে আরোগ্যের আভাস দেখা যেতো। কস্তুরী-মৃগনাভী তিনি তাঁর স্পেশাল থলে থেকে বের করে দেখাতেন। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, তামাটে রঙ, দীর্ঘদেহ, সিঁথি করে আচড়ানো তেলমাখা চুল- কবিরাজ বাদশামিয়া সাহেবকে দারুণ লাগতো। তাঁর মতো গ্যারান্টি দিয়ে এ-জনপদে আরেকজন শুধু কবিরাজী ঔষধ বিক্রি করেন, তিনি হলেন উখিয়ার মহুরীপাড়া নিবাসী জনাব হেকিম জাফর। বহুবার আমি কবিরাজ বাদশামিয়ার ক্যানভাস শুনেছি উখিয়ার দারোগাবাজার হাটে, রুমখাবাজার হাটে, মরিচ্যাপালং হাটে আর কক্সবাজারের লালদিঘিরপাড় এলাকায়। আমার মনে অদ্যাবদি তরতাজা স্মৃতি হয়ে আছে তাঁর কথাগুলো।

মরিচ্যাপালং হাটের মাছবাজার রোড় দিয়ে মাছ কেনার জন্য আমাকে যেতে হতো। এখানে লবণ বিক্রি করতেন ধুরুংখালী নিবাসী দাদা কামিনী শীলের ছেলে হরেন্দ্র কাকা। তাঁর কাছ থেকেই আমি লবণ কিনতাম। একসময় তাঁরা দারিয়ার দিঘি গ্রামে থাকতেন। কামিনী দাদার যন্ত্রপাতির ছোটো চামড়ার বাক্স থেকে ক্ষুর লুকিয়ে রেখেছিলাম বলে কতোবার যে দাদা আমাকে কানমলা দিয়েছে। তিনি আমাদের পরিবারিক ক্ষৌরকার ছিলেন। তো এখানেই একদিন হঠাৎ ছোটোখাটো গড়নের একলোকের ভিন্নধর্মী ক্যানভাস শুনে দাঁড়িয়ে গেলাম। ‘গুনছি এক্কান এক টিআঁ, বলাকা বিলিড় (ব্লেড) এক্কান এক টিআঁ, চায়না বিলিড (ব্লেড) এক্কান এক টিআঁ, বারোয়া সুইঁচ এক টিআঁ’- এভাবে ইঁদুর মারার দাওয়াইও বিক্রি করছে। কোনো জড়তা নেই ভদ্রলোকের মুখে। খইফোটার মতো শব্দ করে বিরতিহীনভাবে বলে যাচ্ছে। গেঞ্জিপরা ভদ্রলোকের মাথার তেল আর ঘাম মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। জীবিকার তাড়নায় আর জীবনের তাগিদে তিনি ঝড়-রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ক্যানভাস চালিয়ে যাচ্ছে। আমি কমপক্ষে তিন-চার চক্কর দিয়ে দিয়ে তাঁর ক্যানভাস শুনেছি। আজও তাঁর সে স্বরটি আমি শুনতে পাই স্মৃতির মান্ডকের ভেতর।

আমার আব্বার সাথে সম্পর্কের ঘনিষ্টতার কারনে ডা. রাখাল চাচাও আমাকে চিনতেন। মাঝে মাঝে আমি তাঁর দোকানে গিয়েও বসতাম। রাখাল চাচার সাথে বহু স্মৃতি রয়েছে। বাড়িতে গিয়ে চাচার গলার স্বর নকল করে কথা বলার চেষ্টা করতাম। রাখাল চাচা অমায়িক মানুষ ছিলেন। রাজনীতির আসর জমানো এমন বক্তা আজকাল কদাচিৎ চোখে পড়ে। এক সন্ধ্যায় উখিয়া সরকারি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে বন্ধু ডা. মুকুন্দসহ রাখাল চাচার বক্তব্য খুব উপভোগ করেছিলাম।

ডা. মদনবাবু ছিলেন আমার দাদা মোহাম্মদ আলী মাস্টারের প্রিয় চিকিৎসক। তাঁর আওয়াজ শুনলেই দাদা অর্ধেকটা ভালো হয়ে যেতেন। কী আশ্চর্য ক্যারিশমাসম্পন্ন ডাক্তার মদনবাবু। রোগীর প্রতি যে অপরিসীম দরদ তিনি দেখাতেন তা তো আজ বিরল ঘটনা। সময়ের কথা বলে তিনি কখনও রোগী কিংবা ডাকতে আসা রোগীর স্বজনদের তিনি ফিরিয়ে দিতেন না। নিশিরাতেও দারিয়ার দিঘির মগচরে রোগী দেখার জন্য তিনি চলে যেতেন।

প্রত্যেক হাটবারে আমি আসতে পারতাম না। তবে যে দিন আসতাম সে দিন প্রথম কাজটি ছিলো আমার মায়ের আপনমামা হলদিয়াপালং নিবাসী আহমদু সিকদারকে খুঁজে বের করা। তারপর অনেকগুলো বাজার নিয়ে বাড়িতে ফিরে যাওয়া, কখনও রিক্সাযোগে আবার কখনও তেলখোলার মেঠোপথে।

মরিচ্যা লালব্রিজের পাশেই ছিলো বাঁশের বাজার। কতো সাইজের যে বাঁশ ছিলো তা দেখে আমি বিস্মিত হয়ে যেতাম। ব্রিজের শুরু থেকে একেবারে পাগলিরবিল রাস্তার মাথা পর্যন্ত বাঁশবাজার বিস্তৃত ছিল। বেশি সুন্দর লাগতো পানের বরজের জন্য আনা ছোটো ছোটো বাঁশগুলো। বিভিন্ন সাইজের বাঁশের ব্যবহার তখনও পুরোপুরি না বুঝতে পারলেও এখন বুঝি। আর এ-ক্ষেত্রে আমাকে বিশেষ সহায়তা করেছে অধ্যাপক আসহাব উদ্দীন আহম্মদ (১৯১৪-১৯৯৪) সাহেবের বাঁশ সমাচার বইটি।

আমি বাজারে আসলেই একটি কাজ প্রথমে করতাম। সেটি হলো হলদিয়াপালং রোড়ের পার্শ্বে মনু সওদাগরের দোকানের সামনে শিশু গাছতলায় গিয়ে দাঁড়াতাম। উদ্দেশ্য শুধু একটিই- চেয়ারে আয়েশীভঙ্গিমায় বসে সিগেরেট আর পানচিবানোরত একজন লোককে একনজর দেখা। এটি প্রায় আমার রুটিন কাজ হয়েছিলো। লোকটিকে ঘিরে থাকতো বেশ কিছু লোকজন। কেউ কেউ তাঁর পাশে চেয়ারে বসা আবার অনেকেই দাঁড়িয়ে তাঁর কথা শুনছে। বাঘাসুরত, ব্যাকব্রাশ করা তেলমাখা চুল, পানেরবাটার মতো গোলমুখ, অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, তাঁর প্রতিটি শব্দ থেকে তাঁর ঋজু ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটছে। আমি মুগ্ধ হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকতাম। ঢোলা পায়জামা-পাঞ্জাবীর ওপর মুজিবকোট তাঁকে অনন্য করে তুলেছে। আমরা তখনও একে অপরকে চিনি না। কিন্তু লোকটিকে এতো ভালো লাগতো যে, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারতাম না। কী শীত, কী গ্রীষ্ম, কী বর্ষা- সবসময় তাঁকে আমি মুজিবকোটপরা দেখেছি। তো একদিন আরেক মুজিবকোর্টপরা আমার পিতা বীর মুক্তিযোদ্ধা জাফর আলম চৌধুরীকে লোকটির কথা জানালাম। আমাকে আব্বা বললেন, ‘আগামী হাটে আমিও তোমার সাথে যাবো লোকটিকে দেখার জন্য। তারপর চেষ্টা করবো তোমাকে তাঁর সাথে পরিচয় করে দেওয়া যায় কি না।’ সত্যিই আমাকে আব্বা তারপরের হাটে ঐ ভদ্রলোকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন আর আব্বা বললেন ‘ইনি ভাষাসৈনিক বীর মুক্তিযোদ্ধা বাদশামিয়া চৌধুরী।’ তারপর আব্বা কোলাকুলি করলেন। দুটি মুজিবকোট পরিহিত মানুষকে আলিঙ্গনরতাবস্থায় অসাধারণ লাগছিলো। তারপর আমার সাথে কোলাকুলি করলেন। এই প্রথম মুজিবকোটপরা একজন ভাষাসৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধার সাথে আলিঙ্গন করতে পেরে খুব খুশি হয়েছিলাম সেদিন। বাদশামিয়া চৌধুরী আর আমার বাবা- এদুজন ব্যক্তি কখনও মুজিবকোট ছাড়া থাকতে পারেন না।

বুধবার। সময় জোহরের নামাজের পর আর আছরের নামাজের আগে আগে। মরিচ্যা বাজারের একেবারে শেষ মাথা। বড় একটি শিশুগাছ। অনেকগুলো মানুষ গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কেউ বসে আছে। আমিও গিয়ে দাঁড়ালাম। আবারও বাদশামিয়া কবিরাজ। তাঁর সাথে আজকে নিয়ে এসেছে ছোটোখাটো গড়নের একজন লোক। বাদশামিয়া কবিরাজ নিজে লোকটিকে পরিচয় করিয়ে না দিয়ে বললো তার কাজ করতে। লোকটি ভেংচি দিয়ে ওঠলো। লোকটি ফুলপ্যান্ট খুলে ফেলার সময় মানুষজন হেসে ওঠলো। প্যান্ট খুলে দেখা গেলো ভেতরে আছে ঢিলেডালা একটি হাফপ্যান্ট। গায়ের গেঞ্জিটি খুলে ফেললো। তারপর লোকজনের দিকে ভেংচি মারলো। মানুষ তো হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে।

বাদশামিয়া কবিরাজ তাগাদা দিলো সময়ের দিকে খেয়াল রাখতে। কারণ, তাঁরা তো এসেছেন রিজিকের ফিকিরে। মানুষকে মাগনা বিনোদন দেওয়ার জন্য নয়। তাঁদের দেওয়া বিনোদনের সাথে রিজিকের যোগসূত্র রয়েছে। তাগাদা পাওয়ার পর লোকটি উদোম শরীরের পেটটি নিয়ে কসরত দেখাতে শুরু করলো। এসব দেখে বাচ্চারা আর উপস্থিত সকলে জোরে জোরে হাততালি আর অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। এবার লোকটি পেটের কসরত বাদ দিয়ে চোখ দুটো নিয়ে খেলা শুরু করলো। ‘ইবা লঅরে আর ইবা নঅ লঅরে’- বলে একনাগাড়ে একটি চোখ নাড়তে শুরু করলো। সবাই তো অবাক। লোকটির গলার স্বর বিচিত্র। দেহভঙ্গি আরও বিচিত্র। তাঁর দেহভঙ্গি দেখেই মানুষের পেট ফেটে যাওয়ার অবস্থা। লোকটি এবার শুয়ে পড়লো। ওখান থেকেই দেখাতে লাগলো কীভাবে ঢেঁকিতে ধান ভানা হয়। তারপর দেখালো হেলিকপ্টার উড়া।

লোকটিকে থামিয়ে দেওয়া হলো। বাদশামিয়া কবিরাজ যৌবনবন্দনা দিয়ে ক্ষয়িঞ্চু যৌবনের অধিকারীদের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন। কয়েক পুটিকা বিক্রিও হলো। হাতে অবশিষ্ট আছে মাত্র কয়েক পুঠিকা। সেগুলো বিক্রি করে লোকটিকে বললো এবার তার পালা। লোকটি এবার নিয়ে এসেছে দাঁতের মাজন। ঝটপট বিক্রি হয়ে গেলো। হাতে আর মাত্র তিনটি মাজন রয়েছে। লোকটি বললো এগুলো বিক্রি হয়ে গেলে আরেকটি খেলা দেখিয়ে বিদায় নেবেন। সাথে সাথেই বিক্রি। লোকটি এবার সিগেরেট ধরালো। তারপর বললো, বলেন তো আমি সিগেরেটের ধোঁয়া কোন দিক দিয়ে বের করবো? সবাই বললো, ‘নাক দিয়ে।’ লোকটি তা তৎক্ষণাৎ নাকচ করে দিয়ে যা দেখালো তাতে সবাই হতভম্ব হয়ে গেলো। সত্যি সত্যিই লোকটি চোখ দিয়ে ধোঁয়া বের করে দেখালো। আমরা মুগ্ধ হলাম। আমরা বিস্মিত হলাম। মনের খুশিতে জোরে হাততালি দিলাম।

এতক্ষণ ধরে যার কথা বলা হচ্ছে তাঁর নাম লাটের পুত কালাইয়া। তিনি আজ আর নেই। তিনি আর কোনোদিন আসবেন না। তাঁর স্মৃতিবিজড়িত কক্সবাজারের লালদিঘিরপাড়, মরিচ্যাপালং, উখিয়ার দারোগাবাজারের মাটিগুলো সাক্ষী হয়ে আছে। বেশ মনে পড়ে লাটেরপুত কালাইয়ার কথা। মনেপড়ে বাদশামিয়া কবিরাজের কথা।

যে জনপদে আমি বেড়ে ওঠেছি সেখানে বহুরকম কুশীলব ছিলেন। এখনও কেউ কেউ আছেন। শুধু আমার ঘুরে-ফিরে দেখার সময়টুকু নেই। আর কোনোদিন সময় বোধহয় পাবো না। কীভাবে যে বদলে যাচ্ছে আমার স্মৃতির জনপদ।

স্মৃতি বিস্মৃত হয় কালের ঠেলায়। বেলা-অবেলায় হারিয়ে যায় স্মৃতিবহর। কিন্তু যে মানসপটে আমি গেঁথে রেখেছি আমার বেড়ে ওঠা জনপদের স্মৃতি- তা তো আমৃত্যু অমলিন থাকবে।

মরিচ্যাপালং হাটে বায়োস্কোপ দেখেছি। সাপের খেলা দেখেছি। তারপর কিছু মার্বেল কিনে বাড়িতে ফিরে আসতাম। তখন বাজারের রাস্তার পাশে ছোটো ছোটো ভাসমান দোকান বসতো। এগুলোকে ছটকির দোকান বলা হতো। তাদের কাছে অনেক কিছু পাওয়া যেতো। আমি একদিন একটি গানের বইও কিনলাম। পরে বুঝেছি আমার হৃদয়ে গানের স্বর আছে সুর নেই। তা-ই আর কোনোদিন স্টেজে গান গাওয়ার বাসনা জাগেনি।

আমি মাঝে মাঝে এখনও মরিচ্যাপালং হাটে যাই। নতুন প্রজন্মদের আনাগোনা দেখে বেশ খুশি লাগে মনে। আপ্লুত হই এ ভেবে যে, স্মৃতির জনপদে নতুন কুশীলব। আফসোসে কখনও কখনও মনটা বিষিয়ে ওঠে- এপ্রজন্মের ভাবনা আর অবলোকন ভিন্নধর্মী দেখে। নতুন প্রজন্ম দায়িত্বশীল হলে ঐতিহ্য কখনও হারিয়ে যাওয়ার হুমকিতে পড়বে না।

উলামিয়া ফকিরের সাথে আমার বেশ ভাব জমেছিল। সুন্দর মানুষ সুন্দর মন তাঁর ছিলো। আমি গেলে চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদী পত্রিকাটি হাতে দিতেন। তাঁর দোকানে বসাছিলাম এক শেষ বিকেলে। তখন আমি প্রতিদিন একবার পত্রিকা পড়তে মরিচ্যা আসতাম। দারিয়ার দিঘি থেকে মরিচ্যা তো মেলা পথ, তাও আবার পদব্রজে। তাঁর সারের দোকানটিতে বেশ বিক্রি হতো। তো সেই শেষ বিকেলেই আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার খবরটি দৈনিক আজাদী পত্রিকা মারফত জানতে পারি। উলামিয়া সওদাগর অতিথিপরায়ণ ছিলেন। আমি গেলে চা না খাইয়ে ছাড়তেন না। আপনারা হয়ত তাঁকে এখন আর দেখেন না কিংবা খুঁেজ পান না অথবা কোনোটারই প্রয়োজন অনুভব করেন না। কিন্তু আমার সাথে তাঁর দেখা হয়। তিনি ভালো আছেন।

আমার বুড়োবন্ধু আম্বিয়া বাপের কথা বেশ মনে পড়ে। নানা বলে সম্বোধন করতাম তাঁকে। নিরহঙ্কার, নির্লোভ, সজ্জন, পরহেজগার- যতোই অভিধা দেওয়া হোক না কেনো তা তাঁর বেলায় প্রযোজ্য। মরিচ্যা হাটে আসা-যাওয়ার পথে তাঁর সাথে দেখা হতো। একবার না দেখে বাড়িতে গিয়ে দেখা করে আসি। তাঁর ভাই হাছান আলী মাস্টার তো আরেক কিংবদন্তী। আমি প্রায় সময় তাঁর বাড়িতে যেতাম। কতোকথা যে বলতেন। বেশিরভাগ ছিলো আমার নানা আলহাজ ফয়েজ আহমদ চৌধুরী (ফয়েজ কোম্পানী)-এর কথা। কালের এক দুর্দান্ত কুশীলবরা আজ অদেখা ভুবনে বসতি করছেন। আর আমি স্মৃতিভান্ডার খুলে দেখছি ফেলে আসা মুহুর্তগুলোর কথা।

আমার শৈশবের নায়ক হলদিয়া পালং এর মোক্তার মিয়া এখন নতুন উপাধি নিয়ে ধীর কদম ফেলে। কদাচিৎ সাক্ষাৎ মেলে আদিল কাকার (কবি আদিল চৌধুরী) জ্ঞানবৃক্ষ হলে। পেঠান ফকিরও সেখানে আস্তানা গেড়েছে। শশ্রুমন্ডিত মোক্তার ফকির দিলদরাজ মানুষ। তাঁর বেহালার সুর আমার মনের ভেতর এখনও বেজে ওঠে। এতো সুরের উপকরণ থাকতে অদ্যাবদি বেহালাই আমার প্রিয়। মোক্তার ফকিরের সাথে ছিলেন পাগলিবিলের রহিম মিয়া। কী সুন্দর গান গাইতেন। শুনেছি তিনি এখন মুয়াজ্জিন। মোক্তার মিয়ার বহু ঠঅঁশা আমি দেখেছি। তিনি গান শুরু করতেন ওস্তাদবন্দনা দিয়ে এভাবে:

ওস্তাদের নাম আহমদ কবীর

বদরখালি নিজগ্রাম

হলদিয়া নিজের বাড়ি

মোক্তার মিয়া আমার নাম

আগে আল্লারো নাম

মদিনার সোনার চাঁন

জগতে মানি খোদা কোরআনে আসমান।

মোক্তার মিয়ার গানের অনুষ্টান দেখে শুধু ভাবতাম এরকম বেহালাবাদকই হবো। পুরোজীবন সুরের সাথে কাটাবো। বেহালার তার মানুষের মনে যে স্বপ্ন সৃষ্টি করতে পারে, মানুষকে যে অন্তহীন ভাবনায় নিয়ে যেতে পারে- তা মোক্তার মিয়ার বেহালা বাজানো যারা শুনেননি তারা উপলব্ধি করতে পারবেন না।

প্রতিটি মানুষের মনে বেহালার সুর ধ্বণিত হয়। সুরের জন্যে মানুষ হতে হয়। আজকাল মানুষের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। মানুষের খোলস পরে দাবিয়ে বেড়াচ্ছে অমানুষ। এ-ভাবনায় অস্থির হয়ে আমার বন্ধু আবদুল গফুর হালী মাইজভা-ারী (১৯৩৬-২০১৬) বলেছিলেন, ‘ মানুষ কোথায় পাবো? যাদের দেখতে পাচ্ছি তারা তো মানুষ নয় কিন্তু দেখতে মানুষের মতো’।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। পরিচালক, পালং একাডেমি, কক্সবাজার।

Please Share This Post in Your Social Media

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

More News Of This Category
© 2018 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | dbdnews24.com
Site Customized By NewsTech.Com