1. azadzashim@gmail.com : বিডিবিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম :
  2. litonsaikat@gmail.com : neelsaikat :

সভ্যতার বিপর্যয় | সুমন চন্দ্র সরকার

  • Update Time : সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২০
  • ১৭০ Time View

সভ্যতার ক্রমবিকাশে আজ আমরা একবিংশ শতাব্দীতে অবস্থান করছি। তথ্য প্রযুক্তি ও জ্ঞান বিজ্ঞানে আজ আমরা বেশ সমৃদ্ধ। চাঁদের বুড়ির গল্প শুনতে চাঁদে আরোহন করেছি। গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছি। শক্তি ভান্ডারে মজুদ করেছি এটম নামক অহংকার। জীবনকে অধিক আরামদায়ক করতে প্রকৃতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে ব্যাপক ভাবে প্লাস্টিক ও রাসায়নিক দ্রব্যের আবিস্কার করেই চলেছি। নিজেদের অসচেতনতায় প্রকৃতির ইকোসিস্টেমকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছি, ভুলেই গিয়েছি আমরাও প্রকৃতির একটা অংশ। জীব বিজ্ঞানীদের মতে “বাঘ ও হরিণের অনুপাত কেমন হবে তা প্রকৃতিই নির্ধারণ করবে”। তাই আমাদের উচিত প্রকৃতির প্রতি সচেতন হওয়া, কিন্তু আমরা তা করছি কি? চিত্ত বিনোদনের জন্য বন্য পশু পাখিদের বন্দি করে চিড়িয়াখানা বানিয়েছি, কিন্তু আজ! আমরাই গৃহ বন্দী। “COVID-19″ নামক করোনা ভাইরাসে সংক্রামিত হয়ে মানব সভ্যতা হুমকির মুখে। বিজ্ঞানী নিউটনের গতিসূত্র তিন অনুযায়ী ” প্রত্যেকটি ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে”। বর্তমান পৃথিবীর দিকে তাকালেই দেখা যায় যে, কিছুদিন আগেও যে রাস্তাটি ছিল যানজট পূর্ণ সেখানে আজ বন্য প্রাণীরা নির্ভয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সমুদ্র তীরে শত শত কচ্ছপেরা ডিম পাড়ছে, ঘুরে বেড়াচ্ছে। অথচ কিছুদিন আগেও সেটা ছিল কল্পনাতীত। পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার কিছুদিন আগেও পর্যটকে মুখরিত ছিল, কিন্তু আজ সেখানে ডলফিনেরা মনের আনন্দে কবি রজনীকান্ত সেনের “স্বাধীনতার সুখ” কবিতার ছন্দের সাথে ছন্দ মিলিয়ে আনন্দে খেলা করছে, আহ! কি নয়নাভিরাম দৃশ্য।

অপর দিকে মানব জাতি আজ নিজেকে নিজেই গৃহ বন্দী করতে ব্যস্থ। বিশ্বায়ন এখন গৃহায়নে পরিনত হয়েছে। “COVID-19” করোনা ভাইরাসে সংক্রমণের গ্রাফটা দিন দিন উর্ধ্বমূখী হচ্ছে। ইতিমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মহামারি ঘোষণা করেছে। মৃত্যুর মিছিল কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না। এখন পর্যন্ত চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এই ভাইরাসের কোন প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে পারে নি। তাই যুদ্ধক্ষেত্রে যেমন শত্রু পক্ষের শক্তি বেশি হলে পোড়ামাটির নীতি অনুসরণ করে যুদ্ধ পরিচালনা করা হয়, ঠিক তেমনি ভাবে করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত করোনা ভাইরাস সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষার জন্য কোয়ারেন্টাইন বা সঙ্গরোধ এবং আইসোলেশন বা নিঃসঙ্গতাই হল একমাত্র উপায়। পৃথিবীর প্রত্যেকটা দেশের সরকার ও রাষ্ট্র প্রধানরা সেই ব্যবস্থায়ই গ্রহণ করলেন। আমাদের সকলের উচিত সেই ব্যবস্থা মেনে চলা। শক্তির জোরে ডাইনোসরও পৃথিবীতে ঠিকে থাকতে পারে নি। এমন কি বিগত সময়ে অনেক মানব সভ্যতাও ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছে। আমরা তা জেনে-শুনেও কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্তা মানছি না কেন? একটা গল্পের মাধ্যমে বিষয়টা নিয়ে ভাবা যাক। অতি প্রাচীন কালে কোন এক রাজকন্যার ইচ্ছে হলো দুগ্ধ পুকুরে স্নান করবেন। রাজকন্যার ইচ্ছে বলে কথা, রাজা শুনা মাত্রই রাজ কর্মচারীদের পুকুর খননের আদেশ করলেন এবং সমগ্র রাজ্যে ঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করলেন যে যেসকল প্রজাদের গাভী আছে, তারা আগামীকাল সূর্যদ্বয়ের পূর্বেই সম্পূর্ণ দুধ রাজার পুকুরে ঢেলে দিয়ে আসতে হবে। যদি কোন প্রজা তা অমান্য করে, তাহলে তাকে দন্ড প্রদান করা হবে। সারা দিন সকল প্রজারাই মনস্থির করলো, রাজার পুকুরে দুধ ঢেলে দিয়ে আসবে, কিন্তু সন্ধা হতে না হতেই তাদের অনেকের মনেই ভিন্ন চিন্তার উদয় হলো। অনেকেই ভাবতে লাগলো, সবাই তো দুধ নিয়েই যাবে, তাছাড়া ভোর রাতে কেউ কাউকে দেখবেও না সুতরাং আমি যদি দুধের পরিবর্তে এক বালতি জল দিয়ে আসি, তাহলে কেউ তা বুঝতেই পারবে না। পরদিন রাজার পুকুরে দুধ ও জলের অনুপাতটা কেমন হয়েছিল ইতিমধ্যেই আপনার মাথায় চলে এসেছে।

করোনা ভাইরাস সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য জনগণকে কোয়ারেন্টাইন এ রাখতে সারাদেশে এখন জরুরী অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। জরুরী প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়া নিষেধ। স্বাভাবিক ভাবেই রাস্তা ঘাট ফাঁকা। তাই আমাদের মাথায় চিন্তা এলো রাস্তা ঘাট তো ফাঁকাই, আমি একা বের হলে কিচ্ছুই হবে না, তাই কোন একটা জরুরী অজুহাতে বের হয়ে পরলাম আর ঘটনা চিত্রটা গল্পের মতোই ঘটতে লাগলো কিন্তু ফলাফলটা যে কতটা ভয়ংকর হতে পারে তা আমরা এখনও বুঝতে পারছি না….। বাঁচার জন্য মানুষ কুমিরের পিঠে চড়েও সাঁতার কাটে। তাই আমাদের এই গল্প থেকে বেড়িয়ে আসতেই হবে। এটা ঠিক যে আমাদের সমস্যার অংকটা অনেক জটিল কিন্তু এমন তো নয় যে সমাধানের পথ নেই। বর্তমানে বাংলাদেশের ১০% লোক দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করছে, দিন এনে দিন খেতে হয়, তাই তাদের তো ঘরে বসে থাকলে চলবে না। আবার একটা গল্পের মাধ্যমে বিষয়টা নিয়ে ভাবা যাক। প্রাচীন ভারতে এক ধার্মিক রাজা ছিলেন, প্রজা পালনে ছিলেন একনিষ্ঠ । সেই রাজা হঠাৎ এক গভীর রাতে স্বপ্নে একটা ভয়ংকর দ্বৈব বানী শুনেছিল, ফলে রাজা সে রাতে আর ঘুমাতে পারে নি, রাজা তার স্বপ্নের উপর খুবই বিশ্বাসী ছিলেন। স্বপ্নের দ্বৈব বানীটা এমন ছিল “হে মহান রাজা, আপনি অনেক সৎ ও ধার্মিক কিন্তু আপনার উজির, নাজির ও প্রজারা দিন দিন অসৎ হয়ে পরেছে, বন্য পশু পাখিদের শত্রু ভেবে অকারণে মেরে ফেলছে, বন জঙ্গল সব উজার করে ফেলছে তাই তাদের উচিত শিক্ষার জন্য আগামী ১ লা ফাল্গুন সকালে আপনার রাজ্যে বিষাক্ত জলের বৃষ্টি হবে, বৃষ্টির জল যেখানে পরবে সেখানেই বিষাক্ত হয়ে যাবে। অর্থাৎ পুকুর-ঘাট, খাল-বিল, নদ-নদী ও সমুদ্র সহ সকল উৎসের জলেই বিষাক্ত হয়ে যাবে এবং আগামী ২১ দিন পর্যন্ত এই বিষাক্ত প্রভাব থাকবে। সেই বিষাক্ত জল পান করলেই মানুষ পাগল হয়ে যাবে”। তখনকার দিনে নলকূপ, কুয়া এগুলো ছিল না তাই রাজা খুব চিন্তিত হয়ে জরুরি সভা ডাকলেন। রাজ্যের বিশেষজ্ঞদের আহবান করা হল। রাজা সবাইকে বিষয়টি খুলে বললেন এবং সবার মতামত জানতে চাইলেন। এমন পরিস্থিতিতে জল মজুদ রাখা ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই বলে সকল বিশেষজ্ঞরা মতামত দিলেন। রাজা সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করলেন এবং সমগ্র রাজ্যে ঘোষণা করে দিলেন, সবাই যেন আগামী ১লা ফাল্গুনের আগেই প্রয়োজনীয় জল মজুদ করে রাখে । প্রজারাও তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী জল মজুদ করতে শুরু করলো। যার যেমন সামর্থ্য কেউ ৫ কলস, কেউ ১০ কলস, এভাবে কেউ ২০, ৫০, ১০০ কলস মজুদ করে রাখলো। অনেকেই আবার বিশ্বাস ও করে নি। যা হওক ১ লা ফাল্গুন সকালে সমগ্র রাজ্যেই বৃষ্টি হলো। প্রজারা তাদের মজুদ পানি পান করতে লাগলো এভাবে ৫-৭ দিন যাওয়ার পর অনেকেরই মজুদ পানি শেষ হয়ে গেলো। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে এবং অনেকে অবহেলা করে অনান্য উৎসের পানি পান করতে লাগলো পরদিন দেখা গেল সেইসব মানুষ সত্যি সত্যিই পাগল হয়ে গেলো। চারদিকে সেটা ছড়িয়ে পরায় রাজ্যের সকল মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পরলো। রাজ্যে জরুরী অবস্থা ঘোষণা করা হলো এবং সকলকে অনুরোধ করা হলো, একে অপরের সহায়তা করতে। কিন্তু অধিকাংশ লোক নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েই ব্যস্ত ছিল, যার ফলে দিনের পর দিন পাগলের সংখ্যা বেড়েই চলছে……, ২০ তম দিনে দেখা গেল রাজ্যের ৯৫ শতাংশ লোক পাগল হয়ে পরেছে কিন্তু অবশিষ্ট ৫ শতাংশ লোকের হাতে এখনো ছয় মাসের জল মজুদ আছে । কথায় আছে পাগল কখনো নিজেকে পাগল মনে করে না, তাই যা হওয়ার তাই হলো। রাজ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হল, পাগলরা রাজাকে পাগল বলতে শুরু করলো। রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভেঙে পরলো। রাজা এ অবস্থা দেখে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে পাগল হয়ে গেল।

যদিও গল্পটি কাল্পনিক কিন্তু এ থেকে আমরা যদি শিক্ষা গ্রহণ না করি, তাহলে অতীতে বিলীন হয়ে যাওয়া অনেক মানব সভ্যতার মতোই আমাদেরও করুন পরিনতি আসতে পারে। তাই আসুন উঁচু, নিচু ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে একে অপরের প্রতি সচেতন হয়ে করোনা ভাইরাস কে প্রতিহত করি।

লেখক : এক্সিকিউটিভ, ব্র্যাক ব্যাংক লিঃ

Please Share This Post in Your Social Media

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

More News Of This Category
© 2018 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | dbdnews24.com
Site Customized By NewsTech.Com