1. azadzashim@gmail.com : বিডিবিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম :
  2. litonsaikat@gmail.com : neelsaikat :

বিজ্ঞাপনে নারী: বিজ্ঞাপিত নারী | সুতপা বেদজ্ঞ

  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ৫ আগস্ট, ২০২১
  • ১২৮ Time View

নারীকে নিয়ে সমাজে মুখরোচক আলোচনার অন্ত নেই। নারীর ওঠা-বসা-চলা-ফেরা-পোশাক-হাসি-কান্না এমন কি সুখ-দুঃখের প্রকাশ নিয়েও ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ চলতে দেখা যায় অহরহ। নারীর প্রতি সহিংস আচরণের জন্যও দায়ী করা হয় নারীর পোশাক বা আচরণকে। দেশে যখন আশি বছরের বৃদ্ধ নারী থেকে শুরু করে তিন-চার বছরের কন্যাশিশু পর্যন্ত বীভৎস পৈশাচিক কায়দায় ধর্ষণের শিকার হয় তখনও আঙ্গুল তোলা হয় নারীর পোশাক, নারীর চলা-ফেরার দিকে।

সমাজের এই মানসিকতার আগুনে ঘি ঢালছে নারীকে নিয়ে তৈরি মর্যাদাহীন, যৌন আবেদন সৃষ্টিকারী কুরুচিপূর্ণ বিজ্ঞাপন ও পর্নোগ্রাফির প্রচার।

দুনিয়াব্যাপী প্রচার মাধ্যমের বিকাশ মানুষের সামনে এক বিরাট জ্ঞান ভাণ্ডারকে উন্মোচিত করেছে। প্রচার মাধ্যম আজ এতটাই শক্তিশালী যে পৃথিবীর রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতির মতো ইহজাগতিক যাবতীয় আচার-আচরণ, শিক্ষা-সংস্কৃতির ওপর তা গভীর প্রভাব ফেলছে।

সভ্যতার ইতিহাস থেকে জানা যায়- ব্যক্তিগত সম্পত্তি উদ্ভবের সাথে সাথে সম্পত্তিতে নারী অধিকার হারায় এবং পরজীবী হিসেবে সমাজে পরিচিত হতে থাকে। সেখান থেকে আজও পর্যন্ত নারীর মুক্তি মেলেনি। এখনো অনেকক্ষেত্রে মেয়েরা বস্তু বা পণ্য হিসেবে বিবেচিত। নারীর নিজস্ব সত্তা, মেধা বা মননকে নয়, বরং দৈহিক-বাহ্যিক রূপকেই বড় করে দেখা হয়।

আমরা এখনো এমন এক দুনিয়ায় বসবাস করছি যেখানে সবকিছুই পুঁজিতন্ত্রের মুনাফা ও পুরুষতন্ত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। পুঁজিতন্ত্রের প্রধান ও একমাত্র লক্ষ্য মুনাফা। আর পুরুষতন্ত্র ঠিক করে দেয় নারীকে সমাজ কী চোখে দেখবে, শিশুদের মূল্যবোধ কীভাবে তৈরি হবে। এক্ষেত্রে প্রচার মাধ্যমগুলো বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে পুরুষতন্ত্র ও পুঁজিতন্ত্রের ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে বড় ভূমিকা রাখে।

নারীকে অবদমনের মাধ্যমে পুরুষতন্ত্র টিকে থাকে আর পুঁজিতন্ত্রের লক্ষ্য থাকে অবদমিত নারীর মনোজগতকে বিকাশের সুযোগ না দিয়ে পণ্যের বিপণনের কাজে ব্যবহার করা। মোটকথা পুরুষ প্রভুর ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখা। বেটি ফ্রাইডান তার ‘দ্যা ফেমিনিন মিস্টিক’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন- ‘পুঁজিবাদী সমাজে নারী শুধু পণ্যই নয়, পণ্যের প্রধান ভোক্তাও বটে। বাজার অর্থনীতির লক্ষ্য হচ্ছে গৃহবধূ।

পুরুষতন্ত্র তাকে রমনীয়, নমনীয়, মনোযোগী পরিচর্যাকারী ও চর্চিত স্ত্রী হিসেবে মহিমান্বিত করার চেষ্টা করে বাজারের প্রয়োজনেই। তখন গৃহবধূ হিসেবে নারীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়ে পড়ে ঘরের জন্য আরো জিনিস কেনা। বিজ্ঞাপন প্রচারের মাধ্যমে নারীকে আরো সুন্দরী, আকর্ষণীয় হওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলা হয়। যার মূল কথা হচ্ছে নানা দ্রব্য ক্রয়।’

আজকাল কী গ্রাম কী শহর ক্যাবল লাইন সংযোগের কল্যাণে শিশুদের ঘুম ভাঙে বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল সুর শুনতে শুনতে। পরিবারের বড়রা এখন আর গল্প বলে শিশুদের খাইয়ে দেবার মত কষ্টসাধ্য কাজ করতে চান না, শিশুরা খাবার গ্রহণ করে বিজ্ঞাপনের প্রচারে ডুব মেরে। বিজ্ঞাপন ছাড়া প্রচার মাধ্যম অচল অন্যদিকে বিজ্ঞাপণের লক্ষ্য হচ্ছে যেকোনো মূল্যে পণ্যের বিপণন।

এখানেই নারী ব্যবহৃত হচ্ছে। বিজ্ঞাপন নারীকে সেভাবেই তুলে ধরছে যেভাবে তুলে ধরলে বিক্রি বাড়বে। বিজ্ঞাপনে নারীকে অনেকাংশেই হেয় করে দেখানো হয়। ‘কিছু বিজ্ঞাপন দেখলে মনে হয় কাপড় কাঁচা, মুখমণ্ডলের সৌন্দর্য বাড়ানো, শরীরের মেদ কমানো ছাড়া আর কিছুতেই নারীর আগ্রহ নেই। নারী পুরুষের তুলনায় নির্বোধ এবং পুরুষের মনোরঞ্জনের জন্য নিজেকে উপস্থাপন করার মধ্যেই নারী জীবনের সার্থকতা। নারী যেন বিবেক-বিবেচনাহীন একটা যৌনবস্তুমাত্র।’

শত প্রতিক‚লতা অতিক্রম করে গত কয়েক দশক ধরেই কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণের মাত্রা অনেক বেড়েছে। শিক্ষা-চিকিৎসা-প্রশাসন থেকে শুরু করে নির্মাণের মত কষ্টসাধ্য পেশায়ও নারীরা সাবলীলভাবে কাজ করে যাচ্ছে। অথচ অধিকাংশ বিজ্ঞাপনে নারী এখনও ঘরের মধ্যেই আবদ্ধ। গুঁড়া মসলায় রান্না, সংসারের সকলের স্বাস্থ্যের কথা ভেবে তেলের ব্যবহার আর চায়ের কাপে বা কোমল পানীয়ে তৃপ্তির চুমুক দেয়াই নারীর ভবিতব্য।

অর্ধনগ্ন নারী ছাড়া বিউটি সোপের বিজ্ঞাপন যেন হতেই পারে না। যে সব বিজ্ঞাপন নারীকে কর্মজীবী হিসেবে দেখায় সেখানেও তার মূল পরিচয় হয়ে ওঠে গৃহিণী। ‘নারীর মেধা ও কর্মক্ষমতাকে বিজ্ঞাপনে করে তোলা হয় হাস্যকর। কর্মক্ষেত্রে নারীর যেটুকু সাফল্য অর্জিত হয় তাও হয় কোন বিশেষ পাউডার বা ক্রিম মাখবার জন্য। …নারী শুধু টয়লেট পরিষ্কারে চ্যাম্পিয়ন। নারীর কৃতিত্ব নারীর নয় কোন তেলের বা আটার। বাস্তবের গৃহিণীদের মতো ময়লা-কালি-ঘাম-হলুদে ব্যতিব্যস্ত হন না বিজ্ঞাপনের নারী।’

তা সত্তে¡ও সমাজে অনেক পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি এখন পাল্টেছে। তার প্রমাণ মেলে ডয়চে ভেলের দর্শক ইঞ্জিনিয়ার শাহাবুদ্দিনের কথায়। তিনি প্রশ্ন করেছেন-নারীরা কি আসলেই মানুষের মর্যাদা পেয়েছে? তিনি দুঃখ করে লিখেছেন-‘টিভির অ্যাডভারটাইজমেন্টে, বিলবোর্ড, মিডিয়ায় নারীদের প্রদর্শন কি নারীকে আদৌ কোন সম্মান বা স্বাধীনতা দিয়েছে? গাড়ির অ্যাডের সাথে সাজসজ্জায় অর্ধনগ্ন নারী, পুরুষের ব্যবহৃত পণ্যের সাথে নারী, শিশুদের চকোলেট, আইসক্রিমের অ্যাডে, পুরুষের বডি স্প্রে, শেভিং ক্রিমের অ্যাডে যৌনউদ্দীপক নারী, ফ্যাশন শো, সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় সবখানেই কেবল নারী দেহ প্রদর্শনীর প্রতিযোগিতা।

পণ্যের মার্কেটিং এর একমাত্র হাতিয়ার হলো নারী দেহ। আর এইসব বিজ্ঞাপন নির্মাতারা অধিকাংশই পুরুষ, তারা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এন্টারটেইনের কথা বিবেচনা করেই বিজ্ঞাপন সাজায়। তারা জানে এই সমাজে নারীর প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি আসলে কেমন। নারীকে পুরুষেরা শুধু পণ্যই ভাবে।’ বর্তমান সময়ে এই সমাজের একজন পুরুষের কাছ থেকে এ ধরনের বয়ান অবশ্যই ইতিবাচক। যদিও এই মানসিকতার পুরুষ সংখ্যায় কম, তবু তারাই নারীর এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা হিসেবে কাজ করছে।

বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য বিষয়ে বিবেচনাবোধ নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যেই আসতে হবে। বাংলাদেশে বর্তমান কোভিড অতিমারী সময়ে অনেক নারী অনলাইন ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। জীবন বাঁচাতে এ ধরনের জীবিকা বেছে নেয়া নারীর জন্য খুবই ইতিবাচক। কিন্তু বিপত্তি ঘটে তখনই যখন নারী পণ্যের বিজ্ঞাপনের জন্য লাইভে আসছেন এবং উদ্ভট সাজে পণ্যের বদলে নিজেকেই উপস্থাপন করছেন বেশিমাত্রায়।

ইংরেজি বাংলার মিশেলে এক ধরনের খিচুড়ি ভাষা প্রয়োগ করে এমন অঙ্গভঙ্গি করছেন যা না করেও বরং সাবলীলভাবে পণ্যের উপস্থাপন করতে পারতেন। নারীকে মনে রাখতে হবে তার এ ধরনের উপস্থাপন নিজেকে তো মর্যাদাবান করেই না বরংসমাজে তাকে ন্যাকা, ঢংগি, রঙিলা, মাল এসব নেতিবাচক শব্দ শুনতে হচ্ছে। নারী-পুরুষ উভয়েই সাজে, সাজতে ভালোবাসে।

সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে সাজের ক্ষেত্রে এসেছে নানা ধরন ও পরিবর্তন। সাজ-পোশাক মন্দ কিছু নয়। মানুষের রুচিশীলতার পরিচয় বহন করে সাজ-পোশাক। সংস্কৃতি, আবহাওয়াগত কারণে ভিন্ন ভিন্ন দেশের সাজ পোশাকে ভিন্নতা রয়েছে। নারীদের এক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন সুন্দর দেখাতে বাড়াবাড়ি রকমের রংয়ের ব্যবহার বা অন্য সংস্কৃতি থেকে ধার করে আনা পোষাকের ব্যবহার পুরুষতন্ত্রে বিশ্বাসীদের দৃষ্টিভঙ্গিকে সমাজে পাকাপোক্ত রাখতে বিশেষ ভ‚মিকা রাখে।

নারী শুধু পণ্যের বিজ্ঞাপনে বিজ্ঞাপিত হচ্ছে তা-ই নয় পর্নোগ্রাফির মাধ্যমেও নারীর দেহকে পণ্য হিসেবে দেখানো হচ্ছে। বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে নারীর নেতিবাচক প্রচারের মতো পর্নোগ্রাফির অবাধ প্রচার সমাজে নারীকে হেয় ও কেবলমাত্র ভোগ্যবস্তু হিসেবেই পরিচয় করিয়ে দেয়। ডিজিটালাইজেশনের কল্যাণে এ সকল পর্নোগ্রাফি এখন সহজলভ্য।

আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায়, পরিবারে ও সমাজে যৌন শিক্ষা নিয়ে এক ধরনের লুকোচুরি রয়েছে। অপ্রাপ্ত বয়সের ছেলে-মেয়েদের শরীর সম্পর্কে নানা কৌতূহল থাকে। তাদের প্রশ্নের উত্তর যেহেতু তারা সরাসরি পায় না তাই অনেককেই লুকিয়ে পর্নোগ্রাফিতে আকৃষ্ট হতে দেখা যায়, যা পরবর্তীতে সমাজে নারীর প্রতি নানা অপরাধসংঘটনে ভূমিকা রাখে।

কিশোর বয়স থেকেই নারীকে তারা পণ্য ভাবতে শুরু করে যা সারা জীবনেও কাটানো সম্ভব হয় না। এছাড়া বিভিন্ন বাণিজ্যিক সিনেমার পোস্টারে অধিকাংশক্ষেত্রে অর্ধ উলঙ্গ, প্রায় উলঙ্গ নারীর ছবি সাটানো হয়, যা শুধু দৃষ্টিকটু নয়, নেতিবাচকও বটে। বিজ্ঞাপন নারীর মর্যাদাহীন গৎবাঁধা ইমেজকে সামনে নিয়ে আসে আর পর্নোগ্রাফি নারীকে যৌনতাসর্বস্ব পুরুষের মনোরঞ্জনকারী দাস হিসেবে সমাজে পাকাপোক্ত করে।

আমাদের দেশে জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা রয়েছে, রয়েছে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন। জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা-২০১৪ এর ৩.৪.৬ এ বলা হয়েছে- রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় তথা জীবনের সর্বক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি নারীর সমমর্যাদা ও সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে ভ‚মিকা পালন করতে হবে এবং কোন বক্তব্যে নারীকে অবদমিত/হীনভাবে উপস্থাপন করা যাবে না। ৪.৪.৬ এ বলা হয়েছে-প্রয়োজনানুগ সংশ্লিষ্টতা ব্যতীত বিজ্ঞাপনে নারীর অহেতুক ও দৃষ্টিকটু উপস্থাপন পরিহার করতে হবে।

অন্যান্য সকল ক্ষেত্রের মতো বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রেও দেখা যায় নির্মাতারা আইন বা নীতিমালা, নীতি বা নৈতিকতার তোয়াক্কা না করেই ব্যবসায়িক স্বার্থে নারীকে ব্যবহার করে চলেছে। সমাজের নৈতিকতা ও আচার-আচরণ নির্ভর করে ঐ সমাজের শিল্প-সাহিত্য-জ্ঞান-বিজ্ঞান, সংস্কৃতি চর্চার গতি-প্রকৃতির ওপর।

সমাজের সংস্কৃতিগত মান উন্নয়ন, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্র বিকশিত না হলে মানুষের চেতনার বিকাশ হয় না, দৃষ্টিভঙ্গিও বদলায় না। দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর সাথে সাথে প্রথা-আচার আচরণ সবই বদলায়। যে সমাজ গতানুগতিক গতিহীনতার মধ্যে ঘুরপাক খায়, সবকিছুর ঊর্ধ্বে কেবল মুনাফাকেই দেখতে চায়,সে সমাজ নৈতিকতা, মানবিকতা বা নারী-পুরুষের সম-মর্যাদা সম্পন্ন জাতি গঠনের ক্ষেত্রে ভ‚মিকা রাখতে পারে না।

একথা সমাজের গণতন্ত্রমনা প্রগতিশীল অংশকে যেমন বুঝতে হবে তেমনি নারীকেও বিষয়টি গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে। নারী-পুরুষের সমন্বয়ে মর্যাদাবান জাতি গঠন যা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকারতা বাস্তবায়ন করতে হলে নারীকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে- নারী কী বিজ্ঞাপনে বিজ্ঞাপিত হবে, না কী অবস্থা বদলাতে সক্রিয় হবে।

লেখক : নারীমুক্তি আন্দোলনের নেত্রী।

Please Share This Post in Your Social Media

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

More News Of This Category
© 2018 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | dbdnews24.com
Site Customized By NewsTech.Com