1. azadzashim@gmail.com : বিডিবিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম :
  2. litonsaikat@gmail.com : neelsaikat :

কোভিড-১৯ : নারীর ওপর লকডাউনের ঘা

  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২০
  • ৮৮ Time View

জিন্নাতুন নেছা : বিশ্বজুড়ে কোভিড-১৯ এর ভয়াবহতায় যখন একের পর এক লকডাউন এবং সোশ্যাল ডিসটেনসিং এর মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, জীবন বাঁচানোর ব্যাপক প্রচেষ্টা চলছে- তখন এটিই আবার একটি বিশেষ শ্রেণির জীবনকে ফেলে দিয়েছে আরো ঝুঁকির মধ্যে। দেশে দেশে বেড়ে গেছে পারিবারিক সহিংসতা এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের মাত্রা। নারী ও শিশু নিপীড়নে থাকা এই বিশেষ শ্রেণির মানুষগুলো কোয়ারেন্টাইনে থাকার কারণে খুঁজে পাচ্ছে না নিজেকে রক্ষার উপায়ও। তারা হয়ে পড়েছে হতবিহ্বল এবং দিশেহারা।

২০১৯ এর ১৯ ডিসেম্বর চীনের উহানে শুরু হওয়া কোভিড-১৯ ক্রমশ বিস্তার ঘটিয়ে বিশ্বে মহামারি আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশে ও এর ব্যাপকতা বিরাজমান এবং পুরো দেশ লকডাউনের আওতায় এবং তা চলমান থাকবে এটা নিশ্চিত।

২০২০ এর ফেব্রুয়ারি থেকে মূলত লকডাউন শুরু হয় প্রথম চীনে। লকডাউনের অর্থ হলো সব দোকান, যানবাহন, নৈমিত্তিক কাজ বন্ধ থাকবে। সবাই যার যার ঘরে অবস্থান করবেন। এর ফলে স্বভাবতই পুরুষরা অবস্থান করছেন তাদের ঘরে পরিবারের সঙ্গে।

ফলে পারিবারিক নির্যাতনের সংখ্যা ও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে অনেক গুন।

বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার নিউজ অনুসারে, ব্রাজিল, জার্মানি, চীন, ফ্রান্স, ইতালি সব দেশেই এ সহিংসতার মাত্রা বেড়ে গেছে খুব উদ্বেগজনক হারে। খবর আসছে, করোনাভাইরাসের উৎপত্তিস্থল এক উহানেই পারিবারিক সহিংসতার মাত্রা বেড়ে গেছে প্রায় তিন গুন। ফেব্রুয়ারিতে লকডাউনের আগে যেখানে সহিংসতার হার ছিল ৪৭ সেখানে এক কোভিড-১৯ মহামারি তা বাড়িয়ে নিয়ে গেছে ১৬২ এ ।

বিষয়টি নিয়ে পারিবারিক সহিংসতা বিশেষজ্ঞ এবং অ্যাকটিভিস্টরা অনেকটা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

এমনকি পারিবারিক সহিংসতা বিশেষজ্ঞ আদ্রিয়ানা মেল্লো বলেন, ‘আমরা মনে করছি ব্রাজিলের রিওডি জেনেরিওতে সহিংসতার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে ৪০% বা ৫০%।’

ইতালির অ্যাক্টিভিস্টদের মতানুসারে, লকডাউনের কারণে একই ছাদের তলায় থাকার কারণে নিপীড়ক সঙ্গী শুনে ফেলতে পারেন এ ভয়ে অনেকেই কল করা থেকে বিরত থাকছেন। তবুও আমাদের কাছে প্রচুর হতাশা মিশ্রিত খুদে বার্তা আসছে। অনেক বিশেষজ্ঞদের ধারণা লকডাউন শিথিল হওয়ার পর পারিবারিক নির্যাতনের ঘটনা বিস্ফোরক আকারে দেখা দিতে পারে।

ট্রেড ইউনিয়নের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, করোনা ভাইরাসের কারণে ঘরে আটকে থাকা সবার জন্যই কঠিন, আর লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য তা একটি বাস্তব দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কোভিড-১৯ এর এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে উন্নত বিশ্বের কাতারে থাকা দেশগুলোতে যদি পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা বৃদ্ধি পেতে থাকে উদ্বেগজনকভাবে, সেখানে বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশ যেখানে কিনা প্রায় ৩০ শতাংশের মতো মানুষেরই ‘নুন আনতে পান্তা ফুরানোর’ মতো অবস্থা এবং যেখানে তিন বেলা অন্ন জোটাতে না পারার জন্যই পারিবারিক নির্যাতন ঘটে থাকে প্রায় ৪০ শতাংশ পরিবারে। সেখানে চলমান লকডাউনে বাংলাদেশের অবস্থা কী হতে পারে তা ভাবতেই অনেকেরই হয়তো আমার মতো গা  শিউরে ওঠার অবস্থা।

দুর্যোগে নারীদের অবস্থা খুবই নাজুক থাকে। ঘরের কাজ থেকে শুরু করে সবকিছুই বেড়ে যায় প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণে। সেখানে কোভিড-১৯ এর মতো একটি ভিন্নধর্মী দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের মতো একটি পুরুষশাসিত দেশে নারীদের অবস্থা যে খুবই নাজুক এবং ভয়াবহ হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ মুহূর্তে প্রায় সব পুরুষই লকডাউনের কারণে ঘরে অবস্থান করছেন যা একজন নারীর স্বামী যদি নিপীড়ক হয়ে থাকেন তাহলে ওই নারীর অবস্থা কতটা ভয়াবহ হবে একবার চিন্তা করলেই মনে হয় তা সহজেই অনুমেয়।

আমার একটি ঘটনার কথা খুব মনে পড়ছে। আমি ২০১৭ সালে একটি গবেষণা কাজ করেছিলাম পারিবারিক নির্যাতন ইস্যুতে। ঘটনাটি ছিল এ রকম, ১৯ বছরের এক চঞ্চল নারী রহিমা (ছদ্মনাম)। বিয়ে  হয়েছিল ১৩ বছর বয়সে। ২৩ বছরের রিফাতের (ছদ্মনাম) সঙ্গে। রিফাত গার্মেন্টসে চাকরি করত। প্রায় প্রতিদিনই রহিমা শিকার হতেন পারিবারিক সহিংসতার তা তরকারিতে লবণ কম হওয়া থেকে শুরু করে নানান কারণেই। রহিমা বলছিলেন, আফা, ‘হামার স্বামী যতহন ঘরে থাহে হামি ততহনই ডড়ে থাহি। এই বুঝি কোন ভুল হবে আর এহনই ডাংগ (মার) শুরু হইবো।’

রহিমার মতো এ রকম ঘরের সংখ্যা বাংলাদেশে বোধকরি খুব কম নয়। তাহলে আজ এই লকডাউনের ফলাফল কী হতে পারে ভাবতে পারছেন? এই ভয়াবহতা শুধু রহিমার মতো গার্মেন্টসে কাজ করা নিম্নবিত্ত নারীদের ঘরেই নয় বরং অনেক মধ্যবিত্ত নারীর ঘরে ও দেখা যায় হরহামেশাই।

এমনকি কোভিড-১৯ এর মতো ভিন্নধর্মী এক দুর্যোগ মোকাবিলায় শহুরে মধ্যবিত্ত কর্মজীবী নারী যাকে কি না ঘরের কাজ, বাইরের কাজ, সন্তান লালন-পালন সবই এক সঙ্গে সামলাতে হয় দুর্গার মতো দশভুজা হয়ে- তার জন্য এক মারাত্মক চ্যালেঞ্জ সামনে ছুড়ে দিয়েছে। এ চ্যালেঞ্জে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে যুক্ত হয়েছে ‘ওয়ার্ক ফর্ম হোম’ বিষয়টি। এর ওপর ওই পরিবারের স্বামীটি ও যদি ‘ওয়ার্ক ফর্ম হোম’ এর আওতায় থাকেন এবং সেই পরিবারে ছোট শিশু থাকে তাহলে আর বলার অপেক্ষায় রাখে না।

মজার বিষয় হলো এ সময়ে ওই পুরুষকর্মী কিন্তু তার নিজের ঘরে দরজার সিটকিনি লাগিয়ে ‘ওয়ার্ক ফর্ম হোম’ করছেন। কিন্তু নারীকেই আবার তার জন্য চায়ের জোগান থেকে শুরু করে দুপুরের খাবার দিয়ে তার শিশুটিরই দেখাশোনা করতে হচ্ছে। সঙ্গে শিশুর, পরিবারের সবার কোভিড-১৯ এর ভয়াবহতা রোধের জন্য বারবার হাত ধোয়া থেকে ঘর পরিষ্কার সব কাজই করতে হচ্ছে। আবার ‘ওয়ার্ক ফর্ম হোম’এর কাজগুলোও তাকে করতে হচ্ছে। তাহলে একবার ভাবুন নারীর জন্য কতটা চ্যালেঞ্জ কোভিড-১৯ দুর্যোগ মোকাবিলা!

কোভিড-১৯ এর এই দুর্যোগের সময় কর্মজীবী নারীদের রূপান্তরশীল সময়ে ব্যক্তি কাঠামো এবং সিস্টেমকে এটা বোঝা খুব জরুরি যে -কর্ম বাইরের হোক কিংবা ঘরের হোক তা যেমন নারীর জন্য তেমনি পুরুষের জন্য।  কোভিড-১৯ এর মতো একটি দুর্যোগ মোকাবিলায় নারীরা যদি ঘরের কাজ করেন সচেতনতা অবলম্বন করার জন্য বারবার ধোয়ামোছা করেন, শিশু পালন করেন তা পুরুষের জন্য ও করণীয়। এ রকম এক পরিস্থিতে ‘ওয়ার্ক ফর্ম হোম’ কতটা যুক্তিযুক্ত? যেখানে বাসা থাকবে কিন্তু পরিবার, সন্তান থাকবে না!

 দুটো পাখা সচল না হলে পাখি যেমনি উড়তে পারে না তেমনি নারী-পুরুষের মধ্যে সহমর্মিতা, সহযোগিতা না থাকলে সংসারও অচল হয়ে যায়। হোম কোয়ারেন্টাইন কিংবা ওয়ার্ক ফর্ম হোম সেটি নতুন করে প্রমাণ করল।

লেখক : উন্নয়ন কর্মী ও গবেষক।

Please Share This Post in Your Social Media

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

More News Of This Category
© 2018 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | dbdnews24.com
Site Customized By NewsTech.Com