1. azadzashim@gmail.com : বিডিবিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম :
  2. litonsaikat@gmail.com : neelsaikat :

সুনীলের স্বপ্ন-সংগ্রাম

  • Update Time : শনিবার, ১ জুন, ২০১৯
  • ৩৬ Time View

।।জহিরুল চৌধুরী।

সুনীল ৪২ বছরের এক যুবক। জন্ম ভারতের হরিয়ানার এক গ্রামে। পডাশুনা হাইস্কুল পর্যন্ত। কলেজে ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু প্রেমের ফাঁদে জড়ানোয় কলেজ আর শেষ করা হয়নি। মাত্র ২৫ বছরে বিয়ে এবং বছর বাদে সন্তানের পিতা।

২০ বছর আগে অর্থাৎ ২০০০ সালে পাসপোর্ট বানিয়ে সৌদি আরবে চলে যাওয়ার নেশা তাকে পেয়ে বসে। একবার সৌদি আরব যায়ও। আবার ফিরে আসে। হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর বেতন যাও মিলত, আদম ব্যাপার্রির টাকা পরিশোধেই তা চলে যেত। বাড়িতে টাকা পাঠানো ছিল প্রায় অসম্ভব। বছর তিনেক বাদে আবার সে ফিরে আসে গ্রামে।

অতপর তার স্বপ্ন যে করেই হউক আমেরিকা যেতে হবে। একবার আমেরিকা যেতে পারলে স্বপ্ন পূর্ণ হবে। অভাব বলতে কিছু থাকবে না। নিকটাত্মীয়দের কাছ থেকে সুনীল জেনে গেছে- আমেরিকার মাটিতে একবার কেউ পা রাখলে, কারো সাধ্য নেই তাকে আর ফেরত পাঠায়।

আমেরিকা অভিবাসীর দেশ। যে কোনো অভিবাসীকে ফেরত পাঠানোর রীতি আর কোথাও থাকলেও আমেরিকায় নেই। নতুন অভিবাসী না এলে আমেরিকার অর্থনীতি মুখ থুবরে পড়বে। রিপাবলিকান-ডেমোক্রেট বক্তৃতার ভাষায় যে যাই বলুক, অভিবাসীর স্রোত আমেরিকায় আসতেই হবে। এসব কথা সুনীলকে কেউ না কেউ শুনিয়েছে আগেই!

বছর তিনেক আগে সুনীলের সমুন্ধি আদম ব্যাপারী ধরে, তেরোটি দেশ ঘুরে পা রেখেছে আমেরিকার মাটিতে। সে-ই খোঁজ দিয়েছে আদম ব্যাপারীর। আমার ধারণা ছিল- বাংলাদেশের মানুষই কেবল যুক্তরাষ্ট্র আসার জন্য পাহাড় পর্বত, সাগর-জঙ্গলে পথ কেটে গন্তব্যে পৌঁছে যাবার চেষ্টা করে। সুনীলের কথায় বুঝতে পারলাম- এই রোগের বিস্তৃতি মহামারীর আকারে ভারতেও। পাকিস্তানিদের মধ্যেও এই রোগের বিস্তৃতি আছে আমি জানি।

বলছিলাম সুনীলের কথা। ১২ই আগস্ট ২০১৭, তারিখটি সুনীল মনে রেখেছে সযত্নে। সেদিন সে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানে চড়ে দিল্লি থেকে পাড়ি জমায় মস্কোর উদ্দেশে। মস্কো থেকে সমাজতন্ত্রী কিউবার রাজধানী হাভানার ফ্লাইট। দিল্লি-হাভানা সরাসরি ফ্লাইট না থাকার কারনেই তার এই ঘোরা পথ।

হাভানার একটি সস্তা হোটেলে গাঁদাগাঁদি করে থাকা। এর কয়েক দিন পর চলে যায় ইকুয়েডর। পাসপোর্টে এসব দেশের ভিসা সংগ্রহ করা হয়েছিল দিল্লি থেকেই। ইকুয়েডর থেকে চোরাই পথে কলম্বিয়ায় ঢোকা। পাসপোর্ট, জামাকাপড় ব্যাগ আর টাকা পয়সা নিয়ে আদম ব্যাপারীর লোক সেদিনই উধাও!

কলম্বিয়া থেকে সমুন্দরে কিস্তিতে (সাগরে নৌকা ভাসিয়ে) কয়েকদিন ভাসতে ভাসতে পৌঁছায় পানামা উপকূলে। জঙ্গল আর সাগর পেরোতে সুনীলদের লাগে অন্তত সাত-আট দিন। পথে খাবার-দাবার বলতে এক পিপা মিঠে পানি আর জলে ভেজা ছোলা। ক্ষুধার তাড়নায় জঙ্গলে হাটতে খুবই কষ্ট হচ্ছিল সুনীলের। সঙ্গীদের কাঁধে দু’হাত ছড়িয়ে কোনোমতে পাহাড় অতিক্রম করে।

ইতোমধ্যে ছয় মাস কেটে গেছে। পানামা থেকে কোস্টারিকা, নিকারাগুয়া, হন্ডুরাস, গুয়াতেমালা হয়ে মেক্সিকো। পুরো রাস্তাই পাহাড় পর্বত আর জঙ্গলে পরিপূর্ণ। নিকারাগুয়ার জঙ্গলে এক অদ্ভুত ঘটনা স্মরণীয় হয়ে আছে সুনীলের। সে রাতটি ছিল ঘুটঘুটে অন্ধকার। সূর্য ডোবার পর একটি বড় গাছের নীচে জড়সর হয়ে বসে আছে তারা।

সবাই ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতর। ঘুম আসছে না কারোরই। হঠাৎ তাদের সামনে মস্তবড় কিছু একটা পড়ল গাছ থেকে। মনে হলো কোনো জন্তু। একজন কাছে গিয়ে দেখল আস্ত পাকা কাঁঠাল। থেতলে ফেটে পড়ে আছে। গ্রুপে ছিল ৮ জন। সবাই এক লহমায় সাবাড় করে ফেলল পুরো কাঁঠাল।

আরেক দিনের ঘটনা গুয়াতেমালার জঙ্গলে। কোনো এক সহৃদয় ব্যক্তি তাদেরকে দেখে দিয়ে যায় কিছু পাঁউরুটি আর পানি। পাঁউরুটির গন্ধ পেয়ে মাঝারি আকারের একটি ভাল্লুক এসে হানা দেয়। কোনো রকমে পালিয়ে তারা প্রাণ রক্ষা করে। বলাবাহুল্য, মানুষের খাবার-দাবার ভাল্লুকের খুব প্রিয়।

সুনীলের সঙ্গে আমার পরিচয় সপ্তাহ খানেক আগে। আমার বাড়ি থেকে ২৫ কিমি দূরে কিংস্টনে একজনকে লেসন দিয়ে খানিকটা বিরতি দেই। সে যে গ্যাস স্টেশনটিতে কাজ করে, সেখানে আমি গিয়েছিলাম গ্যাস নিতে। নতুন অভিবাসীরা সাধারণত খুব উদার হয় দেশি চেহারার মানুষ পেলে।

সুনীল আমাকে ফ্রি কফি অফার করে জানতে চাইল আমার পরিচয়। জ্রাইভিং স্কুলের গাড়ি দেখে আধো ইংরেজী ও হিন্দিতে জানতে চাইল নিরাপদ গাড়ি চালনার ব্যাপারে তাকে আমি সাহায্য করতে রাজি আছি কি-না। আমি মাথা নাড়লে আমার মোবাইল নাম্বার নিল।

তিন-চার দিন আগে হঠাৎ সুনীলের ফোন কল। জানালো- তাকে ড্রাইভিং পরীক্ষার একটি এপয়েন্টমেন্ট যেনো নিয়ে দেই। একই সঙ্গে তাকে যেন দুটি লেসন দেই। কোমরে ব্যথার কারনে কিছুদিন আগে তারিখ করেও পরীক্ষা দিতে পারেনি। আমি রাজি হলাম। এর আগে পরীক্ষা দিয়ে ফেল মেরেছে। দেশে ১৮ বছরের গাড়ি চালনার অভিজ্ঞতা আছে। আমি বললাম- ওকে, আমি তোমাকে লেসন দেব।

প্রথম লেসনের দিন সুনীলের ঘরে উপস্থিত হলে জানালো কোমরের ব্যথা বেড়েছে। তাকে পরামর্শ দিলাম কোমরে ব্যথা হলে কী ধরনের ব্যায়াম করতে হয়। আমেরিকার প্রথম দিনগুলোতে আমারো একবার কোমরে ব্যথা হয়েছিল। কিভাবে ব্যথা হলো জানতে চাইলে বললো- নিয়মিত সোডার কেইস, ওজন হবে অন্তত ২০ কেজি, নামাতে গিয়ে এই ব্যাথা। আরো জানালো সপ্তাহে ৭০/৮০ ঘন্টা কাজ করতে হয়। বেতন ঘন্টায় মাত্র ৮ ডলার।

বেতন শুনে কিছুটা আশ্চর্যই হলাম। কারন এমন কাজে বেতন কখনো ১১/১২ ডলারের নীচে হওয়ার কথা না! গ্যাস স্টেশনের মালিকের বাড়ি কোথায়, জানতে চাইলে বলল- পাকিস্তানি। বললাম- বহু ভারতীয় গ্যাস স্টেশনের মালিক আছে, যারা তোমাকে সানন্দে ঘন্টায় ১১ ডলার দেবে।

জিজ্ঞেস করলাম- তুমি কি কাজ করার অনুমতি পেয়েছো? সুনীল হ্যা বলে মাথা নাড়লে বললাম আজই মালিকের সঙ্গে কথা বলো। তাকে জানাও যে তোমার ওয়ার্ক পারমিট এসে গেছে। যদি সে ১১/১২ ডলার দিতে রাজি না হয়, তবে অন্য কোথাও তুমি কাজ খুঁজে নেবে। আমি তোমাকে কাজের সন্ধান দেব। প্রথম দিন লেসন দিতে গিয়ে এসব কথা।

সুনীলের কাগজ অর্থাৎ এখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের কী ব্যবস্থা নিয়েছে, জানতে চাইলে বলল এক ভারতীয় বংশোদভূত উকিল ধরে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছে। বিজেপি-কংগ্রেসের স্থানীয় নেতাদের হয় সে থাপ্পর দিয়েছে, নয়ত থাপ্পর খেয়েছে। তাই সে আর দেশে ফিরে যেতে চায় না!

দু’দিন পর, আজ সুনীলের খুবই উদ্বেগের দিন। তাকে ড্রাইভিং টেস্ট দিতে নিয়ে যাচ্ছি। স্টিয়ারিং ধরেই বিড়বিড় করে কী জপে কপাল মাথায় হাত বুলালো। বুঝলাম দোয়াদরূদ পড়ে নিল। সুনীলের ইংরেজী বলতে কস্ট হয়। বললাম- হিন্দিতেই বলো, আমি বুঝে নেবো। আর যথাসাধ্য চেস্টা নেব তোমাকে বোঝাতে।

বললাম- নেহি ঘাবড়াও। নো হেসিটেশন, নো টার্ডিনেস। ফোকাস অন হোয়াট ইউ আর ডুইয়িং। ফলো দ্যা রুলস। মনে করো- তোমাকে ওরা ড্রাইভিং লাইসেন্স দিতে চায়। কিন্তু তুমি এর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছো কি-না? ইউ হ্যাভ টু প্রুভড ইওরসেল্ফ! তোমারে প্রমাণ করতে হবে, তুমি লাইসেন্স পাবার উপযুক্ত।

সুনীলকে সাহস দিতে দিতে নিয়ে গেলাম। পথেই সুনীল জানালো- জীবনে কেউ তাকে এত সাহস দেয়নি। বললাম- ১৮ বছর তুমি ভারতে গাড়ি চালিয়েছো, এটাই তোমার ডি-মেরিটস। কারন ওখানে তুমি আইন মেনে গাড়ি চালাওনি। আইন না মানা দেশের মানুষদের হঠাৎ করে আইন মানতে কষ্ট হয়!

পরীক্ষক তাকে নিয়ে গেলেন। ফিরে এলে লক্ষ্য করলাম সুনীলের মুখে হাঁসি, যেন বিশ্বজয়ের! পরীক্ষক হাঁসিমুখে ধন্যবাদ জানিয়ে গাড়ি থেকে নামলেন। বুঝতে পারলাম- আমার প্রথম ছাত্রটি পাস করেছে। আমার অন্তর পূর্ণ। এ পর্যন্ত অনেক ছাত্র-ছাত্রীকে নিরাপদ ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ দিয়েছি। কিন্তু ড্রাইভিং টেস্টে নিয়ে এলাম এই প্রথম কাউকে।

ফেরার পথে সুনীলকে জিজ্ঞেস করলাম- তুমি তোমার গ্যাস স্টেশনের মালিককে তোমার বেতন বাড়ানোর কথা বলেছো কি-না? জানালো- গতকালই মালিককে জানানোর পর এক লাফে ঘন্টায় বেতন ৮ থেকে ১১-তে উন্নীত হয়েছে। আরো জানালো- ‘মালিক বলেছিল সুনীল তোমার ড্রাইভিং টেস্টে পাস করতে অনেক বাকি! আজ আমি পাস করলাম। মালিককে গিয়ে বলবো দেখো- সুনীল ইচ্ছা করলে পারে!’

বললাম- তুমি অত্যন্ত লাকী! আমেরিকায় আসার এক বছরের মাথায় তুমি লাইসেন্স পেয়ে গেছো। তোমাকে ইংরেজী জানার চেস্টা নিতে হবে। বললাম এখানে ফ্রি ইংরেজী শেখার অনেক ব্যবস্থা আছে। একটু ইংরেজী জানলে তুমি অনেক ভালো কাজ পেতে পারো। আমেরিকা দাপিয়ে বেড়ানোর জন্য দু’টি জিনিষ খুব প্রয়োজন- প্রথমটি ড্রাইভার লাইসেন্স, দ্বিতীয়টি ইংরেজী জানা। তুমি গুয়াতেমালার পাহাড় অতিক্রমের মত প্রথম বাঁধাটি অতিক্রম করে ফেলেছো, দ্বিতীয়টিও পারবে।

সুনীলের গল্প শুনতে শুনতে স্মরণে এলো কিছুদিন আগে এমনি দু:সাহসিক অভিযানে বাংলাদেশের ৫৭ তরুন-যুবকের সমুদ্রে আত্মহননের কথা। এমন অভিযান কারো জন্যই অনুসরণের হতে পারে না!

নিউইয়র্ক, ৩১ মে ২০১৯

Please Share This Post in Your Social Media

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

More News Of This Category
© 2018 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | dbdnews24.com
Site Customized By NewsTech.Com