1. azadzashim@gmail.com : বিডিবিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম :
  2. litonsaikat@gmail.com : neelsaikat :

শহীদ ইলিয়াস মাস্টার : শত্রুরা করেছে শহীদ, মিত্ররা করেছে বধ!

  • Update Time : বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২০
  • ৫৩৮ Time View

অধ্যাপক আলমগীর মাহমুদ :

মার্চ মাসে মনোহরী শিরোনাম দিয়ে মুক্তিযোদ্ধার সমজদার সাজলেন, এর কারণ কি প্রফেসর সাব? কিছু সাধ আহ্লাদ জমেছে বুঝি, নইলে সত্য বলার ঝুঁকি নেন কোন লাভে?

সত্য যখন সন্দেহে পরিণত হয় তখন সত্য বলাটাও দায়, এমন পরিবেশে সত্য বলার সাহস করেছি- ‘লোভেও নয়, লাভেও নয়, শুধু প্রজন্মের দায় মুক্তিতে’।

দক্ষিণ কক্সবাজারে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া অধিকাংশই আমার ছাত্র। তারা আমাকে ফোনে জানায় মার্চ মুক্তিযোদ্ধাদের রমজান মাস। এ মাসে অন্যদের মত আপনিও মুক্তিযোদ্ধা ভিত্তিক একটা লেখা লিখুন। লেখাটা মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপক্ষ শক্তির পত্রিকায় পাঠাবেন “স্যার”। স্বপক্ষ শক্তির কাগজগুলো দশমাস মুক্তিযোদ্ধা ভিত্তিক লেখা না ছাপলেও ডিসেম্বর মার্চ মাসে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক লেখা ছাপানোর কাজটাকে তারা ঈমানী দায়িত্ব মনে করে।

অবশেষে তারা টপিকস ঠিক করে দেয়, শহীদ ইলিয়াস মাস্টারকে নিয়ে লিখুন। অন্তত একজন শহীদকেও যদি বাঁচিয়ে রাখতে পারি, উখিয়া স্টেশনে যে ছেলেটি, আগামী কোনদিন আমার আঙ্গুল ধরে হেঁটে চলবে তাকে তর্জনী উঁচিয়ে বলতে পারব ‘বাবা’ যে মাটিতে হেঁটে চলেছি এখানে মিশে আছে ঐ লোকটির রক্ত, তিনিও আমার মত কোন সন্তানের বাবা, কোন ‘মা’র স্বামী, সংসারে বাজার আনার লোক। অফিস থেকে আসার পথে তিনিও আমার মত আইসক্রীম আনতেন, ঈদের দিনে বাবা ছেলে মিলে ঈদগাহে যেতেন- পাকিস্তানীরা কেড়ে নিয়েছে ওনার প্রাণ, করেছে শহীদ। সেই বদৌলতে পেয়েছিলাম স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

মুক্তিযোদ্ধা ইলিয়াস মিয়ার স্মৃতি রক্ষার্থে আমরাই উখিয়ায় গড়েছিলাম শহীদ ইলিয়াস মিয়া পাঠাগার। স্বাধীনতার বয়স আজ চল্লিশ না পেরুতেই, ইলিয়াস মাস্টারের শেষ স্মৃতি চিহ্ন ইলিয়াস মিয়া পাঠাগারকে আমরাই করেছি নিশ্চিহ্ন বইগুলো তুলে দিয়েছি ভাঙ্গারীর হাতে, হয়তো গুড়ের বিনিময়ে, নতুবা ক’টি ভাংতি টাকায়। যেটির মলাট ভাল সেটি নিয়ে গেছি বাড়ির সেলফে, দেয়ালের লিখন “শহীদ ইলিয়াস মিয়া পাঠাগার, তাও আজ শেওলার আস্তরে নিশ্চিহ্ন”।

পৃথিবীর ভারী জিনিস, পিতার কাঁধে পুত্রের লাশ, আর কঠিন জিনিস আপন মানুষের অবহেলা। যে মিত্র শক্তির নেতৃত্বে ইলিয়াস মাস্টার মুক্তিযোদ্ধা হয়েছিল, সেই ভাবধারা শিষ্যরাই আজ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। ১৯৯৬ সালেও একবার ছিল। সেদিন এবং আজ তাদের কাছে কোন দরদই পায়নি শহীদ ইলিয়াস মাস্টার। পায়নি ন্যূনতম মূল্যায়ন, সামান্য সৌজন্যতাও। মুক্তিযোদ্ধারা মরেছে একবার, তাও পাকিস্তানীদের হাতে। হতভাগ্য ইলিয়াস মাস্টার মরেছে তিনবার। প্রথমবার-পাকিস্তানীদের হাতে, দ্বিতীয়বার-ক্ষমতাসীন মিত্র শক্তির হাতে। তৃতীয়বার-মরেছে আমার-আপনার হাতে।

প্রথমবার হয়েছে ‘শহীদ’, দ্বিতীয়বার হয়েছে ‘নির্যাতিত’, তৃতীয়বার হয়েছে ‘বধ’। বধ্যভূমিতে দাঁড়িয়ে জানতে ইচ্ছে হয়- ‘কোনটায় বেশি কষ্ট! ইলিয়াস স্যার’!

“আমাকে বাঁচিয়ে রাখ, এই আত্তি নয় কোন মুক্তিযোদ্ধার”। ইলিয়াস মাস্টার ও অনুভব করেননি এমন গরজ। কেউ পাঠাগার গড়বে, কেউ শহীদ মিনার গড়বে, কেউ ফুল দিবে, কেউ নামটা স্বর্ণে মাড়িয়ে রাখবে, এমন প্রত্যাশা ছিল না তাঁরও। তাঁদের স্মৃতি ধরে রাখলে লাভ হত আমাদেরই। সমাজে আসত শান্তি, স্বস্তি। প্রজন্ম পেত প্রতিবাদের স্প্রিট। উপরে উঠার সিঁড়ি মনে হত মানবতাবাদকে, রাজনৈতিক দলগুলোকে নয়।

একজন হো, চে মিনের স্মৃতি, ভিয়েতনামী প্রজন্ম পেয়েছে স্প্রিট, এগিয়ে নিচ্ছে দেশকে। উদ্বুদ্ধ করছে জাতীয়তাবাদে। আমরা ও তাদের মত ছিলাম, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি অবজ্ঞার কারণে আমরা নিথর। এখন কেউ আর মুক্তিযোদ্ধা হতে চায়না, মুক্তিযুদ্ধের কাজটিকে গর্বের, গৌরবের, বুদ্ধিমানের কাজও মনে করছে না কেউ। প্রতিবাদের ঝুঁকি অনেক ‘শত্রুর কাছেও, মিত্রে কাছেও’। এর চেয়ে সুবিধাবাদ জিন্দাবাদেই লাভ বেশি। ভাবনায় জাতি হারাচ্ছে নেতৃত্বে ও আস্থা। উপরে উঠার সিঁড়ি ভাবছে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগকে।
১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১, ১৯৯০ যে বীর বাঙালির উপহার। হাত উঁচিয়ে যে বাঙালির শ্লোগান ছিল ‘জয় বাংলা’। আজ তারা হাত উপরের দিকে তুলতে নারাজ, বরং নিচে নামিয়ে দু’হাত কচলিয়ে-‘নিজে বাঁচলে বাবার নাম শ্লোগানে বিশ্বাসী’।

চোখের সামনে সন্ত্রাসীর হামলা না দেখার ভানে চলে যায়। দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের দলে একজন আক্রান্ত হলে কেউ করে না প্রতিবাদ। কেউ কেউ অন্যায়কারীকে গোপনে ‘ভালই করেছেন’- ‘উচিত প্রাপ্তিই হয়েছে তার’। ‘ভাবনা’ খারাপ মানুষের সাথে সখ্যতা গড়ে নিজে বাঁচা। এভাবে নীতিভ্রষ্ট মানুষের কাতারে দাঁড়াতে দাঁড়াতে তারাই আজ সমাজে ক্ষমতাধর। আমার-আপনার চারিত্রিক সনদদাতা। কৃতকর্মেই বাঙালি পরিণত হয়েছে ভবিষ্যৎহীন জাতিতে। আশাহত হতে হতে তাঁরা আর একবার ১৯৭১ উপহার দিবে যে ভাবনা ও স্বপ্ন।

উখিয়া অঞ্চলে প্রথম শহীদ ইলিয়াস মাস্টার। তিনি কক্সবাজার সদর উপজেলার ঈদগাঁও নাইক্ষ্যংদিয়া, পোকখালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা-হাফেজ মোবারক আলী। বি.এ পাশ করে ১৯৬২ সালের দিকে তিনি উখিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যোগ দেন। উখিয়াবাসীর ভালবাসার অষ্টপৃষ্টে বন্দীত্বের প্রাপ্তিস্বীকার ঘটিয়েছিলেন, ১৯৬৯ সালে উখিয়া কাজী পরিবারে। কাজী সাজেদা বেগম সাজুর সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হয়ে।
ইলিয়াস মাস্টার উখিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের প্রাণাধিক প্রিয় শিক্ষক এবং এলাকাবাসীর প্রাণের ‘মাস্-সাব’। [চাটগাঁর মানুষ মাস্টারকে চাটগাঁইয়া দরদে একান্ত আপন সম্বোধনে ব্যবহার করে] উখিয়াবাসীর বিশাল ভালবাসাকে সংগঠিত করে স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে, ইস্পাত কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তুলেন, লড়ে যান মাতৃভূমির মুক্তিতে, নতুন নাম ধারণ করেন ‘মুক্তিযোদ্ধা’।

পাকিস্তানী ওৎপেতে থাকা দোসরেরা রাজাপালং থেকে তাকে আটক করে, উখিয়া স্টেশনে এনে রশি দিয়ে বেঁধে প্রথমে ঘুংধুম, পরে কক্সবাজারস্থ পাকিস্তানী কারাগারে নিয়ে যায়। যার নেতৃত্বে ছিল গোলাম রসুল নামের জনৈক বিহারী। এই গোলাম রসুল ঘুংধুম এলাকায় বিয়ের সুবাদে ঘুংধুমের অধিবাসী হন। ইলিয়াস মাস্টার পরবর্তীতে প্রধান শিক্ষক হিসেবে ঘুংধুম জুনিয়র হাই স্কুলে যোগ দেন।

ইলিয়াস স্যারকে বন্দীর ১৫ দিন পর বড় মহেশখালী নিবাসী আমিন মিয়া [তৎ সময়ে পালং হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক পরে রামু খিজারী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক] কে ঐ কারাগারে পাকিস্তানীরা বন্দী করে নিয়ে যায়। [পরে বিশেষ কায়দায় তিনি ছাড়া পান] তাঁর সাথে ঐদিনই ঐ কারাগারে ইলিয়াস মাস্টারের দেখা হয়। দেখা হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ইলিয়াস মাস্টারকে পাকিস্তানীরা কোথাও নিয়ে যাচ্ছিল, আমিন মিয়া স্যার ডাক দিয়ে বলেছিলেনÑ “আপনাকে কোথায় না, কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, অ… মাস্টার সাব, কাপড় চোপড়গুলো নিয়ে যান না, আমিন স্যারের দিকে তাঁকিয়ে তিনি নাকি মৃদু হাসির স্বরে চাটগাঁর ভাষায় বলেছিলেন- “নিয়া… ন… পরিব এহন খতম গরি দিব, অর্থাৎ নিতে হবে না এখনই শেষ করে দিবে।

কক্সবাজারস্থ পাকিস্তানী কারাগার থেকে বের করে নিয়ে যাওয়ার সময় বাঙালি জেল জমাদারকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন… “সন্তান সম্ভবা স্ত্রী রেখে এসেছিলাম যদি মেয়ে হয়, ‘ইয়াছমিন আক্তার মনি’ আর যদি ছেলে হয় তার নাম, ‘শাহেদ ইলিয়াস’ রাখতে বলিয়েন। আমার সাথে মনে হয় ওর আর দেখা হবে না, যদি সম্ভব হয় লেখাপড়াটা করাইতে বলবেন’।

এরপর পাকিস্তানীরা নিয়ে যায় সমুদ্রের বালু চরে, তাঁকে দিয়ে বড় গর্ত খোঁড়ায় তাঁর খোড়া গর্তে তাঁকে শুয়ারে টর্চার করতে করতেই তাঁকে শহীদ করে।

‘শত্রুর কষ্ট মানুষ সইতে পারে, আপনজনের কষ্টে হয় দিশেহারা’- ১৯৭১ সালে যাদের আহবানে, যাদের নেতৃত্বে, ইলিয়াস মাস্টার মুক্তিযোদ্ধা হয়েছিল, সেই স্বগোত্র, স্বজাতিরা আজ ক্ষমতায়। ১৯৯৬ সালেও একবার ছিল। কোনদিনই ভালবাসার মানুষগুলোর কাছে, ভালবাসার দলটির কাছে, ইলিয়াস মাস্টার পায়নি একটুও… ‘দরদ’। রাজাকারের অবজ্ঞা, অবহেলা, সহনীয়। কারণ শত্রুর আচরণতো এমনই হয় বলে। যখন ভালবাসার মানুষ এমন আচরণ করে, সেই বোঁঝা বইবার সাধ্য কি আর মানুষের থাকে? দু’জনই কষ্ট দেয়, যদি একজনকে বেছে নিতে বলা হয়, ইলিয়াস মাস্টার নিশ্চয়ই রাজাকারকেই বেছে নিবেন, কারণ তার দেয়া কষ্টের ভার ‘কম’- ‘সহনীয়’।

গুণী যেখানে সম্মান হারায়, সেখানে প্রজন্ম হতাশ। ইলিয়াস মাস্টারের প্রতি রাজাকারেরও অনাদর, স্বপক্ষ শক্তিরও অনাদর দেখে স্নেহাষ্পদ ছাত্র মো. আদিল দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকায় ইলিয়াস মাস্টারকে নিয়ে যে লেখা লিখেন তার ক’টি পংক্তিমালা যেন ছিল প্রজন্মেরই মনের প্রতিধ্বনি- ‘আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, আজ পর্যন্ত কোন মুক্তিযোদ্ধার সাথেও পরিচয় হইল না, যদি কখনও কোন মুক্তিযোদ্ধার সাথে পরিচয় হয়, তাকে সেলেউঢ জানিয়ে জাতির পতাকাটা তার হাতে ফেরত দিয়ে বলতাম ‘এই বিষাক্ত পরিবেশে আপনাদের দেয়া পতাকাটা উড়ানো সম্ভব নয়, দয়া করে ফেরত নিন”।

ঘরে অশান্তিতে থাকা মানুষ কখনও ঘরমুখো হয় না। শান্তির নীড়কে তখন নরকই মনে হয়। বাবার সম্পত্তির বাটোয়ারায় যখন হেরফের ঘটে, কেউ কাউকে ঠকাতে চায়, বঞ্চিত ভাইবোনেরা হাত মেলায় পরিবারের শত্রুর সাথে। বাবার সম্পত্তি তুলে দেয় নামমাত্র মূল্যে। এখনও দেশপ্রেম থাকায় প্রজন্ম জাতির পতাকাটা ফেরত দিতে চায় মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। প্রাপ্ত বয়সে তারা যখন এ দৃশ্য দেখবে, সেদিন যদি তারা ঘুরে দাঁড়িয়ে কোন পাকিস্তানীর পা ছুঁয়ে বলে- ‘বাবা’… ১৯৭১ সালে আমার বাবা যা করেছিল ‘ভুল’ সবই ভুল, প্রায়ঃশ্চিত্ত করতে লালসবুজ পতাকাটাও তোর কাছে রেখে গেলাম, তার বিনিময়ে হলেও বাবারে ক্ষমা করে দে”।
সেদিন মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তির দর্শকদের গাওয়ার জন্য একটি গানই থাকবে অবশিষ্ট… “চেয়ে চেয়ে দেখলাম আমার বলার কিছুই ছিল না”।

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, সমাজবিজ্ঞান, উখিয়া কলেজ।
ই-মেইল : alamgir83cox@gmail.com

Please Share This Post in Your Social Media

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

More News Of This Category
© 2018 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | dbdnews24.com
Site Customized By NewsTech.Com