1. azadzashim@gmail.com : বিডিবিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম :
  2. litonsaikat@gmail.com : neelsaikat :

মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড | মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

  • Update Time : রবিবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৯
  • ৩১ Time View

পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট। তখনো রাত ভোর হয়নি। কামান, বন্দুক, মর্টার, ট্যাঙ্ক বহর নিয়ে ঢাকা শহরে নেমে পড়েছিল ঘাতকের দল। তাদের গোলাগুলিতে বাতাস ভরে উঠেছিল বারুদের গন্ধে। প্রধানত ধানম-ির ৩২ নম্বরের বাড়িকে লক্ষ্য করে ঘাতকদের তৎপরতা কেন্দ্রীভূত ছিল। কিন্তু গুলি চলেছিল ঢাকা শহরের আরও কয়েকটি টার্গেট করা বাড়িতে। মর্টারের গোলা গিয়ে পড়েছিল দূরের কিছু এলাকাতেও। ঘাতকরা হত্যা করেছিল বঙ্গবন্ধুকে। হত্যা করেছিল তার পরিবারের সদস্যদের। সেই সঙ্গে আরও কয়েকজনকে। ঘটনার আকস্মিকতায় অসার হয়ে পড়েছিল গোটা দেশ।

এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত বা পারিবারিক অপরাধের (ঢ়বৎংড়হধষ পৎরসব) ঘটনা ছিল না। এটি ছিল একটি প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক, পটপরিবর্তনের ষড়যন্ত্রমূলক রাজনৈতিক অপরাধের (ঢ়ড়ষরঃরপধষ পৎরসব) ঘটনা। ক্ষমতাসীনদের অনেক ত্রুটি, বিচ্যুতি, আপস, আত্মসমর্পণের পরও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারার দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে যেটুকু সম্ভাবনা তখন ছিল, এই হত্যাকা-ের ঘটনার দ্বারা দেশকে তার উল্টোমুখী ধারায় পরিচালনার অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল।

সমকালীন ইতিহাসে বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠতম অর্জন হলো তার একাত্তরের সুমহান মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে বিজয় অর্জিত হয়েছিল সেটি এক কালজয়ী ও ঐতিহাসিক নব-অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছিল। উন্মুক্ত করে দিয়েছিল যুগান্তকারী অগ্রগতির নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত। সে সম্ভাবনা আমরা কাজে লাগাতে পেরেছি কী পারিনি কিংবা পারলেও তা কতটুকু পেরেছি- সেগুলো হলো একটি স্বতন্ত্র বিবেচনার বিষয়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে নতুন ইতিহাস রচিত হয়েছিল, সে সত্য অস্বীকার করা যায় না। প্রশ্ন হলো- এ ইতিহাসের নির্মাতা ছিল কে বা কারা?

এ কথা ঠিক যে, চূড়ান্ত বিচারে জনগণই হলো ইতিহাসের নির্মাতা। সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও অসত্য নয় যে, ইতিহাস সৃষ্টিতে ব্যক্তির ভূমিকাও অস্বীকার বা অগ্রাহ্য করা যায় না। ইতিহাসই ‘ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের’ জন্ম দেয়। ইতিহাসের আপন প্রয়োজনেই বিশেষ মুহূর্তে ইতিহাস নিজেই এসব ‘ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের’ যুগান্তকারী ঘটনাবলির প্রাণকেন্দ্রে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। ইতিহাসের হাতে তৈরি হওয়া সেই ব্যক্তিত্বের ভূমিকাই তখন আবার ইতিহাস নির্মাণের ক্ষেত্রে কেন্দ্রিক বা ঢ়রাড়ঃধষ হয়ে ওঠে। জনগণ ও ব্যক্তির ভূমিকা এভাবে পরস্পর পরিপূরক হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াতেই নতুন ইতিহাস নির্মিত হয়ে থাকে।

সন্দেহ নেই যে, বাংলাদেশের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ অধ্যায় আমাদের সুমহান মুক্তিযুদ্ধের নির্মাণে জনগণই স্রষ্টার ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু এ বিষয়েও কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না যে, মুক্তিযুদ্ধের নির্মাণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা ছিল সে ক্ষেত্রে কেন্দ্রিক ও বহুলাংশে নিয়ামক। জনগণের সামনে অবস্থান নিয়ে, তাদের সঙ্গে নিয়ে, কালক্রমে তিনি বাংলাদেশের স্থপতিরূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শধারা, বাংলাদেশের জন্ম- এসব ঐতিহাসিক অর্জন সম্ভব হয়েছিল প্রধানত জনগণের অমোঘ শক্তির ফলে। তা ছাড়া তা সম্ভব হয়েছিল শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, মওলানা ভাষানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, কমরেড মণি সিংহ প্রমুখ অনেক ঐতিহাসিক ব্যক্তির ত্যাগ-তিতিক্ষা-অবদানে। এসব নেতাও ছিলেন কালজয়ী ‘ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব’।

কিন্তু এসব মহান নেতার মধ্যে যিনি ঠিক ক্রান্তিকালীন সময়টিতে জনগণের সংগ্রাম, আশা, আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন-সাধনা ও মনের কথাকে সবচেয়ে উপযুক্ত ও বলিষ্ঠভাবে প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি ছিলেন বাঙালির প্রিয় নেতা- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সে কারণেই একাত্তরের ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে জনগণের অন্তরে ও বাস্তব বিচারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থান ছিল অন্য সব ‘ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের’ ওপরে, এক নম্বরে। এই সত্যকে অস্বীকার করাটি হবে ভুল। তেমনি সবকিছুই বঙ্গবন্ধু দ্বারাই এককভাবে নির্মিত হয়েছিল এবং অন্যান্য নেতার ও জনগণের ভূমিকা ছিল কেবল ‘পার্শ্বচরিত্রের’ এমন ভাবাটিও হবে ভ্রান্ত। উভয় ধরনের ভাবনাই ‘অন-ঐতিহাসিক’ ও একমুখীন পক্ষপাতিত্বের দোষে দুষ্ট।

মুক্তিযুদ্ধের আদর্শধারা ও তার ভিত্তিতে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের ঐতিহাসিক অর্জনগুলোর ক্ষেত্রে, ঘটনা পরম্পরায় বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছিলেন সেসবের প্রতীক ও কেন্দ্রবিন্দুস্বরূপ। এ বিষয়টি নিয়ে অনেকে বিতর্ক তোলার চেষ্টা করে থাকেন। কিন্তু এ নিয়ে বিতর্ক করাটি কেবল একটি অন-ঐতিহাসিক কাজ ও অর্থহীন প-শ্রম হিসেবে গণ্য হতে পারে। কারণ এ বিষয়ে বিরোধিতা বা সব সন্দেহ ও বিতর্কের অবসান বহুলাংশে ঘটে গেছে পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ের ঘটনার মধ্য দিয়ে। কেন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল- এই প্রশ্নের জবাব অনুসন্ধানের মধ্যেই রয়েছে এ নিয়ে সব বিতর্কের অবসানের সূত্র।

কোনো মানুষই সর্বক্ষেত্রের ও সর্বকালের বিচারে সব ধরনের দুর্বলতা-সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত একেকটি বিমূর্ত বিশুদ্ধজন নয়। মানুষ ফেরেশতা নয়। কোনো মানুষের পক্ষেই সেরূপ হওয়া সম্ভব নয়। মানুষ মাত্রই হলো ইতিহাসের ফসল। এটি ইতিহাসেরই কথা। দেশ-কাল-পাত্র তথা ংঢ়ধপব ধহফ ঃরসব-এর কাঠামো ও প্রেক্ষাপটে এবং সমাজে তার শ্রেণিগত অবস্থানের আলোকেই, ইতিহাসে একজন ব্যক্তির ভূমিকার সম্ভাবনা ও সীমা নির্ধারিত হয়। রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রে বলা যায়, শীর্ষ পর্যায়সহ যে কোনো পর্যায়ের নেতা বা কর্মীর ভূমিকা শেষ পর্যন্ত তার দলের চরিত্রের এবং দলের চরিত্র তার শ্রেণি ভিত্তি দ্বারা নির্ধারিত গ-ির বাইরে যেতে পারে না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। মুসলিম লীগের ঝা-া নিয়ে ‘লড়কে লেংগে পাকিস্তান’ আন্দোলনের আবর্তে তিনি রাজনীতি শুরু করেছিলেন তিনি কিন্তু অচিরেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক ভাবধারা গ্রহণ করেন এবং নবগঠিত আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে উঠেছিলেন। পরবর্তী প্রায় তিন দশক ধরে তিনি সেই ধারার রাজনীতিই করেছেন। এক পর্যায়ে, বিশেষত তার নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর, তিনি সেই দলটির একক শীর্ষ নেতা বা সুপ্রিমো হয়ে উঠেছিলেন। তার নেতৃত্বে পরিচালিত আওয়ামী লীগই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিল।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-টি নিছক কোনো ব্যক্তিগত বা পারিবারিক হত্যাকা- ছিল না। সেদিন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্যকে চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে। সেই লক্ষ্যটি ছিল রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শধারা থেকে দেশকে কক্ষচ্যুত করা এবং এ দেশে আবার পরাজিত পাকিস্তানি ধারা ফিরিয়ে আনা। যেহেতু বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের আদর্শধারার ভিত্তিতে অর্জিত স্বাধীনতার প্রতীকী পুরুষ ও কেন্দ্রবিন্দু, তাই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা ছাড়া এ ধরনের উল্টামুখী রাজনৈতিক ডিগবাজি সংগঠিত করা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শধারা থেকে দেশকে ‘সম্পূর্ণভাবে উল্টো পথে’ সরিয়ে আনার জন্য ‘পাকিস্তান-পছন্দ’ রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রকারী শক্তির কাছে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করাটি একটি আবশ্যিক কর্তব্য হয়ে উঠেছিল এবং সেদিন ঠিক সেই কাজটিই করা হয়েছিল।

এ কারণেই দেখা গিয়েছিল যে, ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার সঙ্গে সঙ্গেই মুক্তিযুদ্ধের চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি বদলে ফেলে দেশকে সাম্প্রদায়িক, সামরিক-স্বৈরাচারী, পুঁজিবাদী-লুটপাটতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদ নির্ভরশীলতার পথে টেনে নামানো হয়েছিল। যেহেতু বঙ্গবন্ধু ছিলেন এ দেশে মুক্তিযুদ্ধের চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি টিকে থাকতে পারার ক্ষেত্রে একটি প্রধান ‘খুুঁটি’। তাই মুক্তিযুদ্ধের প্রগতিশীল রাষ্ট্রীয় নীতি বদলানোর জন্য এই ‘খুঁটি’ উৎপাটিত করা আবশ্যক ছিল। সে প্রয়োজনেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে হয়েছিল। এ ঘটনাতেই প্রমাণিত হয় যে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার একটি মূল উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রীয় নীতির ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারার পরিপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল পরিবর্তন সাধন করা।

কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, পঁচাত্তরের ঘাতকদের বিচার কাজ সম্পন্ন হলেও বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে যে সাম্প্রদায়িক, গণতন্ত্রহীন, লুটেরা পুঁজিবাদী শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদের পদলেহনের পথ সূচিত হয়েছিল তা আজও অব্যাহত রাখা হয়েছে। পঁচাত্তরের পর বঙ্গবন্ধুর নিজস্ব দলটি চতুর্থবারের জন্য ক্ষমতায় আসতে পারা সত্ত্বেও সেই ‘মুক্তিযুদ্ধের চার নীতির’ পথে তথা ‘সমাজতন্ত্র-গণতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষতা-জাতীয়তাবাদের’ পথে দেশকে আজও ফিরিয়ে আনা হয়নি। পঁচাত্তর-উত্তর অর্থনৈতিক-সামাজিক নীতি-ব্যবস্থা এখনো বহাল রাখা হয়েছে। এটিই হলো সবচেয়ে ট্র্যাজেডি, বিস্ময় ও পরিতাপের বিষয়।

কিন্তু ইতিহাসের গতিধারাকে বহুলাংশে উল্টে দিতে পারলেও তার সবটুকু অর্জন নিঃশেষ করা যায়নি। তার কারণ, মুক্তিযুদ্ধ যেমন কিনা ছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পরিচালিত একটি সুমহান কীর্তি, তার চেয়ে গুরুত্ববাহী কথা হলো, তা ছিল প্রধানত জনগণের নির্মাণ। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শধারার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু ও আপামর জনগণ উভয়ই অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। এই আদর্শধারা ও জনগনের এই সংগ্রাম থেকে বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার চেষ্টা করলে ব্যক্তি মুজিব আর ইতিহাসের ‘বঙ্গবন্ধু’ থাকেন না।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা সম্ভব হয়েছে ঠিকই, কিন্তু জনগণকে হত্যা করা যায়নি এবং তা কোনোদিন করা যাবেও না! তাই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শধারা আজও জীবন্ত রয়েছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে তা পুনঃপ্রতিষ্ঠা না পেলেও তা নিরন্তর জাগ্রত রয়েছে জনগণের অন্তরে। এবং তা চিরদিন সেখানে জীবন্তই থাকবে। সেই সূত্রেই বলা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবও চিরঞ্জীব রয়েছেন ও থাকবেন কোটি মানুষের অন্তরে। তা এ কারণে যে, বঙ্গবন্ধু ও জনগণের মিলিত কীর্তি হলো মুক্তিযুদ্ধের আদর্শধারা ও তার ভিত্তিতে অর্জিত স্বাধীনতা। জনতার মৃত্যু নেই, তাই মৃত্যু নেই বঙ্গবন্ধুরও!

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি

Please Share This Post in Your Social Media

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

More News Of This Category
© 2018 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | dbdnews24.com
Site Customized By NewsTech.Com