1. azadzashim@gmail.com : বিডিবিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম :
  2. litonsaikat@gmail.com : neelsaikat :

দুর্বৃত্ত -দুর্বৃত্তায়নের’ বিরুদ্ধে মাঠের সংগ্রাম গড়তে হবে

  • Update Time : রবিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
  • ৩৭ Time View

রুহিন হোসেন প্রিন্স :

প্রতিটি বালিশের দাম ৬ হাজার। আর ঐ বালিশ ভবনে উঠানো খরচ ৭৬০ টাকা। ৫ হাজার টাকার বই ৮৫ হাজার টাকায় কেনা। এই কাহিনির মধ্যে খবর বেরুলো হাসপাতালে এক সেট পর্দা কিনতে খরচ ৩৭ লাখ ৫০ হাজার। তারপর শুনলাম ১ বান ঢেউ টিন কেনা হয়েছে ১৭ লাখ টাকায়। এসব লুটপাটের হাজারো খবরের মধ্যে এখন বেরুচ্ছে ‘ক্যাসিনো’ বাহিনী। খোদ রাজধানীতে প্রশাসনের নাকের ডগায় প্রতিদিন শত শত কোটি টাকা উড়ছে ‘জুয়া’ খেলায়। সর্বস্বান্ত হচ্ছে মানুষ আর ঘরে নগদ কোটি কোটি টাকা জমা করছে দুর্বৃত্তরা। টাকা রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছে ভোল্ট। ঐ ভোল্টেও জায়গা নেই। তাই সোনা কিনে রাখা হচ্ছে, এক বাড়িতেই প্রায় হাজার ভরি। এখানেই শেষ নয়, একজনের আরও টাকা রাখা হচ্ছে অন্য বাড়িতে। না এগুলো কোনো কল্পকাহিনী নয়। সম্প্রতি চলা র‌্যাব ও পুলিশের অভিযানের খন্ড চিত্র এগুলো।
মতিঝিলের ক্লাব পাড়ায় শুরু হওয়া এসব অভিযান চলমান। কান টানলে মাথা আসে। কথাটি বহুল প্রচারিত। কিন্তু কতটুকু টানা হবে। আর টানলেও মাথার কতটুকু দেখা হবে, সেটিও দেখার অপেক্ষায় সবাই।
নিশ্চয় সবার মনে আছে, রাজধানীর এই মতিঝিল পাড়ায় শেয়ারবাজারের হাজার হাজার কোটি টাকার লুটপাটের খবর। এই পাড়ারই ব্যাংক ডাকাতির খবর। ব্যাংক ও জনগণকে ফোকলা করে দেয়া হলমার্ক, বিসমিল্লাহ, ডেসটিনি প্রভৃতির খবর। একটা খবর আরেকটি খবরকে ভুলিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু লুটপাটের খবর থেমে নেই। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকার দলীয় ছাত্র-নেতাদের (!) ন্যায্য হিস্যা চাওয়া ৮৬ কোটি টাকা।
ঘুষ-দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলদারি, কমিশন বাণিজ্য আর সর্বশেষ ‘ক্যাসিনো’র খবর, দেশের ‘উন্নয়নের মহাসড়কে’র আরেকচিত্রে দেশবাসী নির্বিকার। এসব যেন সবার জানা। কেউ কিছু বলবে, কিছু একটা হবে, এমনটি ভাবতে পারছেন না কেউ। প্রতিদিন নিজের এলাকায় ঘটনাবলির অভিজ্ঞতাই এমন। আর এমনটি হঠাৎ করে হলো, এমনও নয়। চলছে বহুদিন ধরে। প্রতিকার নেই। তাই প্রশ্ন সর্বত্র। এবার কতটুকু কী হবে?

দুই.
দেশের অর্থনীতিতে ‘চলমান লুটপাটের ধারা’ ও দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির অনিবার্য পরিণতিতে এই অবস্থা। যা আমাদের সংবিধান অনুমোদন করে না। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত সংবিধান নানা কাটছাটের পরও যতটুকু অবশিষ্ট আছে, তাতে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি অংশে দৃষ্টি ফেরানো যাক। সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে ১৩ অনুচ্ছেদে মালিকানার নীতিতে বলা আছে: (১৩) উৎপাদন যন্ত্র, উৎপাদন ব্যবস্থা ও বণ্টন প্রণালীসমূহের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রক হইবেন জনগণ এবং এই উদ্দেশ্যে মালিকানা-ব্যবস্থা নিম্নরূপ হইবে :
ক) রাষ্ট্রীয় মালিকানা, অর্থাৎ অর্থনৈতিক জীবনের প্রধান ক্ষেত্র লইয়া সুষ্ঠু ও গতিশীল রাষ্ট্রায়ত্ত খাত সরকারি খাত সৃষ্টির মাধ্যমে জনগণের পক্ষে রাষ্ট্রের মালিকানা
খ) সমবায়ী মালিকানা, অর্থাৎ আইনের দ্বারা নির্ধারিত সীমার মধ্যে সমবায়সমূহের সদস্যদের পক্ষে সমবায়সমূহের মালিকানা এবং
গ) ব্যক্তিগত মালিকানা, অর্থাৎ আইনের দ্বারা নির্ধারিত সীমার মধ্যে ব্যক্তির মালিকানা।

এসবের কোনো কিছুই কি মানা হচ্ছে? না। চলছে উল্টো যাত্রা। জিয়া-এরশাদ থেকে শুরু করে এখনও পর্যন্ত অর্থনীতিতে একই ধারা বহমান।
দেশে ঘুষ-দুর্নীতি, লুটপাট ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। এর ফলে বৈধ অর্থনীতির বিপরীতে ‘কালো অর্থনীতি’র বিস্তারও বাড়ছে। অনেক অর্থনীতিবিদের মতে, এই ‘কালো অর্থনীতি’ ‘বৈধ অর্থনীতির’ ৮০ শতাংশ। এমনকি মুক্ত বাজারের সমর্থক ব্রিটিশ পত্রিকা দি ইকনমিস্ট বংলাদেশের এই ব্যবস্থাকে ‘চৌর্যতন্ত্র’ নামে অভিহিত করেছে। জাতীয় পার্টি, বিএনপি এবং বর্তমান আওয়ামী শাসন আমলের শাসকরা এই ধারাই লালন করে চলেছে। ক্ষমতাসীনদের পৃষ্ঠপোষকতার বাইরে অবাধ লুটপাটের এই ধারা চলতে পারে না। এক সময় লুটপাটকারীরা পেছন থেকে তাদের সমর্থনে, তাদের স্বার্থরক্ষাকারীদের ক্ষমতার বিভিন্ন কাঠামোতে আনতে সহায়তা করতো। এখন নিজেরাই ক্ষমতায় অধিষ্ঠ। তাইতো অনেক ক্ষেত্রে ‘দুর্বৃত্ত’ ও ‘দলীয় পদ’ সমর্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। লুটপাটের অর্থনীতির সাথে স্বাভাবিকভাবে যুক্ত হয়েছে লুটেরা রাজনীতি, সৃষ্টি হয়েছে লুটেরা মূল্যবোধ ।

তিন.
সাম্প্রতিক ঘটনাবলির পর আমরা আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাল্টাপাল্টি কথা শুনছি। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ‘বিএনপিই ক্যাসিনোর শহর বানিয়েছিল। মদ জুয়া আমদানি করেছিল। বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে আসা সেই অনুপ্রবেশকারীরাই এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে’। আর বিএনপি বলছে, ‘ক্যাসিনো আর জুয়া, আওয়ামী লীগের একক কৃতিত্ব(!)’।
বিএনপির আমলে চালু হওয়া মুক্তবাজারের নামে লুটপাটের অর্থনীতির ধারা এবং পরবর্তীতে দুর্নীতি ও হাওয়া ভবনে এর সম্প্রসারণ নিয়ে কোনো কথা নেই। আত্মোপলব্ধি নেই। বরং আলোচনা উঠলে যুক্তির মারপ্যাঁচে নিজেদের অতীত কাজের যথার্থতা প্রমাণে ব্যস্ত সবাই। মুক্তবাজারের নামে লুটপাটের অর্থনৈতিক ধারার সমর্থকদের জন্য এটাই স্বাভাবিক।
একইভাবে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের কথা বললেও মুক্তিযুদ্ধের অর্থনৈতিক ধারার বিপরীতে মুক্তবাজারের নামে চলমান লুটপাটের ধারা অব্যাহত রেখে চলেছে। তাইতো সাম্প্রতিক ঘটনায় হুঙ্কার আসছে, ‘ধরা পড়লে দল থেকে বহিষ্কার’। এ যেন শুধু দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কাজ। তাইতো ছাত্রলীগ নেতাদের দলীয় পদ হারাতে হলো। আইনের মুখোমুখি দাঁড় করানো হলো না। টেন্ডার বাণিজ্যের সাথে জড়িতদের আমলা-রাজনৈতিকদের মুখোশ উন্মোচিত হলো না। এখনও ‘ক্যাসিনোর’ পাহারাদার, গডফাদার আর মাফিয়ারা থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
বড় বড় প্রকল্পে বড় খরচ-লুটপাট। কাজ না করেই টাকা তুলে নেয়া। হাজার কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ ও খরচের পর পরিত্যক্ত ঘোষণা। শেয়ারবাজার, ব্যাংকের টাকা লুট, ঋণ খেলাপি, আর বিদেশে টাকা পাচার বাড়ছে। হচ্ছে জনগণের টাকার হরিলুট। যার বোঝা এখন টানতে হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও টানতে হবে সাধারণ মানুষকে। এর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ভূমিকা নেই। নেই এসবের উৎস বন্ধে কোনো ভূমিকা।
চলছে প্রধানত আওয়ামী লীগ আর বিএনপির পাল্টাপাল্টি আক্রমণ। মিডিয়াতেও এসব কথাবার্তাই বেশি। এসব প্রচার প্রপাগান্ডা সাধারণ মানুষকে প্রকৃত ‘ঘটনা’ বুঝতে সহায়তা করার বদলে, ‘সহজ সমীকরণ’ টানা বা ‘কার কতটুকু দোষ’ সেই বিবেচনাকেই সামনে আনছে। চলমান আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার সংকটের কথা মানুষের দৃষ্টপটে সামনে আসছে না। আসছে না এ অবস্থার পরিবর্তনের পথের কথা।

চার.
এতসবের পরও দেশের মানুষ চলমান অভিযানকে অভিনন্দিত করছে। মানুষ চায় এই অভিযান চলমান থাকুক। দেশব্যাপী নির্মোহভাবে, শক্ত হাতে এই অভিযান পরিচালিত হোক। অন্তত: কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসুক।
অভিযান পরিচালনা করছে র‌্যাব ও পুলিশ। এটা ঠিক যে, আইনগতভাবে এসব অভিযানে আমাদের নির্ভর করতে হবে এসকল বাহিনীর ওপর। তাদের প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত, তা লিপিবদ্ধ করা, যথাযথভাবে আদালতে উত্থাপনের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। সে ভরসা কি এখনও করা যায়?
পুলিশ স্টেশনের অতি নিকটেই এসব ক্যাসিনো চলছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানতো না এটা কেউ বিশ্বাস করে না। এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী, কর্তাব্যক্তি ও পুলিশের একজন সাবেক মহাপরিচালকের কথায় এটা স্পষ্ট যে, সরকারের সদিচ্ছা, দৃঢ় অবস্থান বিশেষত সরকার প্রধানের নির্দেশনা ছাড়া কোনো কিছু করা সম্ভব না। সরকারি দল ও তার দলীয় কর্মীদের বিরুদ্ধে কিছু করা সম্ভব না দলীয় প্রধানের সিদ্ধান্ত ছাড়া। ‘আইন’ এখানে যেন প্রধান কোনো বিষয় না। প্রচলিত আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা আজ আমাদরে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে।
এই সংকট নিরসনে তাই প্রচলিত আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার স্বরূপ জনগণের সামনে তুলে ধরার কাজটি করতে হবে। একইসাথে চলমান অভিযান যেন অব্যাহত থাকে, সারাদেশে তার জন্যও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। জনগণকে সাথে নিয়ে সারাদেশে ঘুষ-দুর্নীতি, লুটপাট, দখলদার, গডফাদার, মাফিয়াতন্ত্র ও এদের রাজত্ব উচ্ছেদের সংগ্রাম জোরদার করতে হবে।
দুর্বৃত্ত, দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি, এদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট চক্র এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, এরা বসে নেই। নানাভাবে এরা এই অভিযানকে বাধাগ্রস্ত করতে চাইবে। অন্ততপক্ষে ‘ক্যাসিনো’র মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইবে। আর এসব চলমান থাকলে দুর্নীতি, দুর্বৃত্ত, দুর্বৃত্তায়ন আর তার অনিবার্য পরিণতি দুঃশাসন, গণতন্ত্রহীনতা, লুটপাটতন্ত্র থেকে মুক্তি নেই। মুক্তি নেই সাম্প্রদায়িকতা ও সা¤্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্রের জাল থেকে।
জনগণের সচেতন ও সংগঠিত শক্তিই পারে ঐক্যবদ্ধভাবে এই অপশক্তি মোকাবিলা করতে। তাই সাহস করে দুর্বৃত্ত আর দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে মাঠের সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। এজন্য জনগণের ঐক্য গড়ে তোলার কাজ পরিকল্পিতভাবে অগ্রসর করার কাজটিই আমাদের করতে হবে। এর মধ্য দিয়ে গড়ে তুলতে হবে বিকল্প শক্তি সমাবেশ। ঐ শক্তি সমাবেশই প্রচলিত ‘নীতি ও ব্যবস্থা’ বদলের সংগ্রামকে অগ্রসর করে নিয়ে যাবে। মুক্তিযুদ্ধের ধারার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম জোরদার করবে। সেই লক্ষ্যে সর্বত্র বাম প্রগতিশীল দল, সংগঠন এবং সচেতন মহলের দায়িত্বশীল ভূমিকাই সময়ের দাবি।

সম্পাদক ,বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)

Please Share This Post in Your Social Media

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

More News Of This Category
© 2018 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | dbdnews24.com
Site Customized By NewsTech.Com