1. azadzashim@gmail.com : বিডিবিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম :
  2. litonsaikat@gmail.com : neelsaikat :

গ্যাসের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা, রুখে দাঁড়াতে হব

  • Update Time : মঙ্গলবার, ১২ মার্চ, ২০১৯
  • ৬৬ Time View

।।রুহিন হোসেন প্রিন্স।।

জনগণের পকেট কাটা যেন থামছে না। রান্নার চুলায় পর্যন্ত চাপে গ্যাস নেই। দেশে গ্যাস সিলিন্ডারের দাম বেশি। ২০১৪ সাল থেকে বিদ্যুৎ-এর দাম কমানোর কথা থাকলেও দাম বেড়েই চলেছে। সারে উৎপাদন ব্যয় বেশি। শিল্প পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেশি বলে দাম বাড়ানোতো নিত্য ঘটনা। এসব সমস্যার সমাধান নেই।
এর মধ্যে বিদ্যুৎ, সার, শিল্প, আবাসিকসহ সব শ্রেণির গ্রাহকদের ব্যবহৃত গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে গণশুনানী শুরু হতে যাচ্ছে ১১ মার্চ। ১৪ তারিখ পর্যন্ত গণশুনানী চলার কথা। নিয়মানুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রদান করবে বাংলাদেশ এনজি রেগুলেটরী কমিশন (বিইআরসি)।

গণশুনানীর আগেই মন্ত্রী বলেছেন, দাম বাড়াতে হবে। শোনা যায় এপ্রিল থেকে গ্যাসের দাম বাড়াতেই এই কার্যক্রম। গণশুনানীতে দেওয়া প্রস্তাবে দেখা যায় বিদ্যুৎখাতে ব্যবহৃত প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৩ টাকা ১৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৭ টাকা ৬৬ পয়সা অর্থাৎ ১৪২ শতাংশ বৃদ্ধি করতে চাইছে। সারে ব্যবহৃত প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ২ টাকা ৭১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৭ টাকা অর্থাৎ ১৫৮ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। শিল্প খাতে ৭ টাকা ৭৬ পয়সা থেকে ১৫ টাকা অর্থাৎ ৯৩ শতাংশ বৃদ্ধি, ক্যাপটিভ পাওয়ারে ৯ টাকা ৬২ পয়সা থেকে ১৫ টাকা ৭০ পয়সা অর্থাৎ ৬৩ শতাংশ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।

আবাসিক গ্যাসের (মিটার যুক্ত) দাম ৯ টাকা ১০ পয়সা থেকে ১৩ টাকা ৬৫ পয়সা এবং মিটার বিহীন এক চুলার গ্যাসের দাম ৭৫০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা এবং দুই চুলার দাম ৮০০ টাকা থেকে ১২০০ টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। বাজারে থাকা এলপিজি’র দাম নির্ধারণ করে ঐ খাতের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। গত অক্টোবরে ১২ কেজি’র গ্যাস সিলিন্ডারের দাম বাড়ানো হয়েছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। বিইআরসি’র কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করছে এসব কোম্পানি অথচ মূল্য নির্ধারণে এখতিয়ার রাখে না বিইআরসি। তাই কোম্পানিগুলো নিজেদের ইচ্ছে মত দাম নির্ধারণ করে চলেছে। সরকারি খাতে এলপি গ্যাস কোম্পানিগুলোর কোন কর্তৃত্ব নেই। তাই সারা দেশের সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে ন্যায্যমূল্যে গ্যাস সিলিন্ডার পাওয়া থেকে।
গ্যাস আমাদের অন্যতম সম্পদ। এর প্রতিটি ফোটার সঠিক ব্যবহার আমাদের কাম্য। দীর্ঘদিন ধরে এখাতের বিকল্প পথ নির্দেশনা নিয়ে আলাপ-আলোচনা হলেও ক্ষমতাসীনরা সে পথে হাটেন না। গ্যাস রফতানি করার প্রচেষ্টা নিতে, ‘গ্যাসের উপর ভাসছে দেশ’Ñএকথা বলে যেমন প্রচার করা হয়েছিল, আজ গ্যাস আমদানি করতে ‘গ্যাস সংকটের কথা’ সমভাবে প্রচার করা হচ্ছে। অথচ দেশের স্থল ভাগের ও সমুদ্র বক্ষের গ্যাস তোলার যথাযথ উদ্যোগ নেই। বিশেষত সমুদ্র বক্ষে আমাদের অধিকার পাওয়ার পর প্রায় একই সময় মায়ানমার ও ভারত যেভাবে তাদের অংশে গ্যাস তোলার সফলতা দেখতে পারলো আমরা একেবারেই তা পারলাম না। আমাদের নজর চলে গেল প্রধানত গ্যাস আমদানির দিকে। এ ক্ষেত্রেও ভারতের থেকে আমরা দেড়গুণ বেশি দাম দিয়ে আমদানি করছি। আমদানিকৃত গ্যাস যে পাইপ লাইনে সরবরাহ করার কথা তার অব্যবস্থাপনার কারণে শত কোটি টাকা গচ্চা যাওয়ার খবর সকলের জানা।
গ্যাস খাতে নৈরাজ্য, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা দূর করার উদ্যোগ নেই সরকারের। সর্বশেষ অনুষ্ঠিত গণশুনানীতে ভোক্তাদের পক্ষ থেকে একথা প্রমাণ করা হয়েছিল যে, মিটারবিহীন দুই চুলায় রান্নার জন্য প্রতি মাসে যে পরিমাণ গ্যাস ব্যবহার হিসেব করে দাম নির্ধারণ করা হয, গড়ে তার অর্ধেক ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ গ্রাহক যা ব্যবহার করেন তার থেকে দাম দেন অনেক বেশি। একাধিক বিতরণ কোম্পানির নিজস্ব সমীক্ষা ও মিটার দেওয়া চুলায় এটা প্রমাণিত। তাই মিটারহীন চুলায় মিটার না দিয়ে দাম বৃদ্ধি অযৌক্তিক ও অনৈতিক। এক্ষেত্রে দাম বাড়লে প্রতিমাসে সাধারণ গ্রাহকদের জীবন-যাত্রার উপর চাপ বাড়বে। আর এটাকে পুঁজি করে গ্যাস মিলিন্ডারেও আরেক দফা দাম বাড়বে। এমনিতেই গ্যাস সিলিন্ডারের দাম বেশি। একথা স্বয়ং মন্ত্রীও বলেছেন। ১২ কেজির ১ সিলিন্ডারে গ্যাস থাকে ১৬ ঘনমিটার। এর দাম বর্তমান হিসেবে ধরলে কোনোভাবে ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকার বেশি হতে পারে না। পাশ্ববর্তী দেশ ভারতেও গ্যাস সিলিন্ডারের দাম আমাদের থেকে কম। সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণে যুক্তিপূর্ণ অবস্থান ও সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে সারা দেশে সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা করা যাবে না।
বিদ্যুৎ, সার, শিল্পে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পেলে এই অজুহাতে বিদ্যুৎ, সার এর মূল্য এবং শিল্পে উৎপাদিত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে। যা সাধারণ মানুষের জন্য আরেক বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। অর্থনীতিতে চাপ পড়বে।

এবার গ্যাসের দাম বাড়ানোর জন্য এলএনজি আমদানির জন্য ঘাটতিকে প্রধান যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে। অথচ এই এলএনজি আমদানি করতে ভারতের থেকে কেন আমরা বেশি দাম দিচ্ছি, তার কোন যৌক্তিক ব্যাখ্যা নেই।

এ বিষয়ে গত বছর জুন মাসে অনুষ্ঠিত গণশুনানীতে মূল্যবৃদ্ধির পক্ষে যথাযথ যুক্তি দেখাতে পারেনি কোম্পানিগুলো। এর পরও গত ১৬ অক্টোবর ২০১৮ তে বিইআরসি এক আদেশে জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল থেকে ১ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা এবং সরকারি তহবিল থেকে ৩ হাজার ৮০ কোটি টাকা সরবরাহ করে ঘাটতি সমন্বয়ের আদেশ দেয়। গত অক্টোবরে এই হার সমন্বয়ের পর মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে নতুন করে গ্যাসের ট্রান্সমিশন চার্জ, ডিস্ট্রিবিউশন চার্জ এবং ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাসের মূল্য হার আবারও পুনঃনির্ধারণ আবেদন বিইআরসি’র নীতিমালার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও অযৌক্তিক বলেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা ।

এছাড়া ১৬ অক্টোবর ২০১৮-এর মূল্যহার নির্ধঅরণে বিইআরসি’র আদেশকে অন্যায্য ও অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে ঐ আদেশ বাতিলে যুক্তি তুলে ধরে বিইআরসিকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ কনজুমাস এশোসিয়েশন (ক্যাব)। ঐ আবেদনে গ্যাসের মুল্যহার বাড়ানোর যুক্তিকে নাকচ করে দেখানো হয়েছে যে, ঐ মূল্যহার পরিবর্তনে এই অর্থ বছরে তিতাসে গ্যাস কোম্পানির রাজস্ব উদ্বৃত্ত থাকবে ৬৮১.৭৭ কোটি টাকা। এছাড়া তিতাসকে বিতরণে ২ শতাংশ সিস্টেম লস সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তাতে তিতাস সিস্টেম লস সমন্বয়ের সুবিধা নিয়ে এ অর্থবছরে বাড়তি ৩১১.১২ কোটি টাকা লাভের সুযোগ পাবে। তাছাড়া গণশুনানীতে সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানিসমূহ তাদের স্ব-স্ব চার্জ বৃদ্ধির যৌক্তিকতা ও ন্যায়সংগতা প্রমাণ করতে পারেনি। তারপরও সেসব চার্জ বৃদ্ধি করার ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে প্রায় ১৪৩১ কোটি টাকা রাজস্ব উদ্বৃত্ত হবে তিতাস গ্যাস কোম্পানীর। এসব যুক্তিকে অগ্রায্য করে গ্যাসের দাম বাড়ানো কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না।

সরকার সাধারণ মানুষের স্বার্থ না দেখে দেখছে ব্যবসায়ী, লুটেরা আর কমিশন ভোগীদের স্বার্থ। গ্যাস খাতের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, ভুলনীতি দূর করতে ব্যবস্থা নেই। নেই দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা। সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ যেন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠান সাধারণ মানুষের স্বার্থ না দেখে বিশেষ গোষ্ঠী স্বার্থ দেখছে। এর বিরুদ্ধে জনসচেতনা সৃষ্টি ও ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ ছাড়া সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা করা যাবে না।
আমরা দেশের গ্যাস সম্পদ দেশের মানুষের স্বার্থে ব্যবহার নিশ্চিত করতে চাই। এজন্য দেশের গ্যাস সম্পদের সুষ্ঠ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকা শহরসহ অনেক স্থানে বয়লারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গ্যাসের অপব্যবহার হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে সর্বক্ষেত্রে গ্যাসের সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। এ কাজে পরিকল্পিত উদ্যোগ দেখছি না। এছাড়া দেশের শতভাগ মালিকানা নিশ্চিত করে স্থল ও সমুদ্রের গ্যাস ক্ষেত্র সুনির্দিষ্ট করা ও উত্তোলনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এসব কাজে উদ্যোগ নেই, অথচ সংকট এর কথা বলে আমদানিতেই উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের স্বার্থে এ অবস্থার পরিবর্তন করা জরুরি।

সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত ও দক্ষভাবে গড়ে তোলা হচ্ছে না। এখন কোম্পানি করার নামে এসব প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ যেভাবে বিভিন্ন ব্যক্তি ভোগ করার সুযোগ পাচ্ছে তার পরিবর্তন ঘটানো দরকার। এজন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে দক্ষ, যোগ্য করার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। বাজেট থেকে এই অর্থ সংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে ব্যক্তি মালিকানার নামে যেসব একচেটিয়া প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে তা জনগণকে জিম্মী করে ফেলছে। জনগণের স্বার্থরক্ষায় এসব বিষয়ে দেশপ্রেমী বিশেষজ্ঞদের বিকল্প কার্য নির্দেশনা থাকলেও, তা কার্যকর হচ্ছে না। তাই সরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল কার্যক্রম নিশ্চিত করতে জনগণকে পাহারাদারের ভূমিকা নিতে হবে।
বিগত দিনে এসব বিষয়ে গণশুনানীতে জনস্বার্থ রক্ষিত হয়নি। বরং গণশুনানীতে জনস্বার্থ লঙ্ঘন করে দুর্নীতিবাজ প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তিবর্গ ও সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তারপরও গণশুনানীতে বামপন্থী, প্রগতিশীল দল, সংগঠন ও দেশপ্রেমিক বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতি, যুক্তিপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরার মধ্যদিয়ে জনস্বার্থের করণীয় দেশবাসীর সামনে তুলে ধরা হয়েছে। সচেতন জনগণ কিছুটা হলেও তথ্য উপাত্ত পেয়েছেন। একই সাথে রাজপথে সংগ্রাম চলমান থাকায়, দেশবাসীর সামনে সরকার ও লুটেরাদের স্বার্থের ভূমিকা স্পষ্ট করা হয়েছে।

এবারেও গণশুনানীর খবর পাওয়ার পরপরও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)সহ বাম, প্রগতিশীল দল, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ সরকারের এই অযৌক্তিক, অনৈতিক কর্মকা-ের বিরুদ্ধে রাজপথে সক্রিয়। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও বিক্ষোভ সংগঠিত হচ্ছে। এসব সমাবেশ-বিক্ষোভ থেকে দাবি উঠেছে, গণশুনানীর নামে গ্যাসের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা বন্ধ কর। চুলায় নিয়মিত গ্যাস দাও। মিটার ব্যবস্থা চালু কর। সারাদেশে ন্যায্যমূল্যে নিরাপদ গ্যাস সিলিন্ডার চাই। গ্যাস খাতে অপচয়, দুর্নীতি, অপচয় বন্ধ কর। দুর্নীতিবাজদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাও। শতভাগ মালিকানা নিশ্চিত করে সমুদ্র বক্ষের ও স্থলের গ্যাস উত্তোলনে ব্যবস্থা নাও। এলএনজি আমদানির নামে সাধারণ মানুষের পকেট কাটা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট, কমিশন ভোগীদের পকেট ভারী করার অপনীতি বন্ধ কর।
জনসম্পৃক্ততা বাড়িয়ে এসব দাবিকে আরও জোরদার করে গ্যাসের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা রুখে দাঁড়াতে হবে। এর মধ্যদিয়েই রক্ষা করতে হবে সাধারণ মানুষের স্বার্থ ।

লেখক: রাজনীতিবিদ।

Please Share This Post in Your Social Media

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

More News Of This Category
© 2018 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | dbdnews24.com
Site Customized By NewsTech.Com