1. azadzashim@gmail.com : বিডিবিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম :
  2. litonsaikat@gmail.com : neelsaikat :

কবি মানিক বৈরাগী’র ৫০তম জন্মদিনে বিশেষ ক্রোড়পত্র

  • Update Time : বুধবার, ২৭ জানুয়ারী, ২০২১
  • ৪১৬ Time View

সময়ের কবি মানিক বৈরাগী, শৈশব থেকেই পারিবারিক সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক সচেতন পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। শৈশব থেকেই জাতীয় শিশু কিশোর সংগঠন খেলাঘর আসর মাতামুহুরি খেলাঘর আসর দিয়ে সাহিত্য সৃংস্কৃতি পরিবেশে বড়ে উঠা পরিচয়। সেই শৈশব থেকেই গণ সঙ্গীত, আবৃত্তি শেখা আর খেলাঘর এর দেয়ালিকায় লেখা ছাপানোর উৎসাহ থেকে ছড়া’র সাথে সখ্যতা। ক্লাস সেভেনে প্রথম প্রিন্ট আকারে ছড়া প্রকাশিত হয়। অধ্যাপক কবি রাহগীর মাহমুদ এর ছোট কাগজে সেখান থেকে ছড়া লেখা কৈশোরে নিজ উদ্যোগে ছড়া পত্রিকা প্রকাশ ও সম্পাদক ‘পন্ড শ্রম”। তারুণ্যে এরশাদ বিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও কাব্য আন্দোলনে জড়িয়ে পড়া। ছাত্র সংসদ নির্বাচন সেই সময় প্রকাশ করেন ভাজ পত্রিকা ” মুক্তির উল্লাস”। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে গেলে সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী ছাত্র সংগঠন হত্যার উদ্যেশ্য হামলা করলে পড়ালেখায় ছেদ পড়ে। কক্সবাজার কলেজে বিএ পাশ পরিক্ষা ও তিন টি দেয়া হয়নি। কারণ তখন ছাত্র সংসদ ছিল সেই মৌলবাদী ছাত্র সংগঠনের দখলে। তাদের চাঁদা দিয়ে পরিক্ষা দিতে ইচ্ছে না করায় আর দি নাই। এরপর ধারাবাহিক ছাত্ররাজনীতি ও দলিয় রাজনীতি। বৃহত্তর চকরিয়া উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন। জেলা ছাত্রলীগের ও গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে দায়িত্ব পালন। বিগত চার দলিয় জোট সরকারের সময়ে বহু মামলার ফেরারি জীবন, পুলিশের হাতে গ্রেফতার, রিমান্ড, ও জেল খাটা।পুলিশি রিমান্ডের কারণে আজ শারিরীক সক্ষমতা রহিত অবস্থায় আছি। জেল ও ফেরারি জীবনের কারণে জন্মদাতা পিতা মাতার নামাজে জানাজা ও পড়তে দেয়া হয়নি। জোট সরকারের সময়ে ছাত্রদল যুবদলের ক্যাডাররা আমার থাকার ঘর হামলা করে ভেঙ্গে দেয়। পুড়িয়ে কয়েক লক্ষ টাকার নিজ সংগ্রামের বই , জেল থেকে বের হয়ে দেখি আমার জন্য রাজনীতিতে শূণ্য স্থান কোথাও নেই। তারপর আবার ও ফিরে আসা লেখালেখির জগতে প্রকাশিত কবিতা গ্রন্থ চারটি- গহিনে দ্রোহ নীল, শুভ্রতার কলঙ্ক মুখস্থ করেছি, নৈনিতালের দিন, শের এ মানিক বৈরাগী। শিশুতোষ গল্প গ্রন্থ দুটি- বন বিহঙ্গের কথা, ইরাবতী ও কালাদান। বিবাহ বিরোধী অবস্থান ও ঘোষণা থেকেও ভাই বোন মিলে হটাৎ এসে জোরপূর্বক কক্সবাজারের বাসা থেকে তুলে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে আটকে রেখে বিয়েতে সম্মতি আদায় করা কবি মানিক বৈরাগী’র ৫০তম জন্মদিন উপলক্ষ্যে ডিবিডি নিউজ২৪.কম এর পক্ষ থেকে বিশেষ ক্রোড়পত্র পাঠকের কাছে তোলে ধরা হলো।

মানিকের জন্য একগুচ্ছ রজনীগন্ধা
আলম তৌহিদ

মুক্তিযুদ্ধ শুরুর ঠিক দুই মাস আগে মানিকের জন্ম। অর্থাৎ সে ছাড়পত্র নিয়ে এসেছিল সুতীব্র চিৎকারে নিজের অধিকার ব্যক্ত করার। হয়ত সেদিন তার জন্ম চিৎকারে কেঁপে ওঠেছিল মাতামুহুরীর ধারাজল। তারপর শিকলঘাটের চড়ায়-চড়ায়, মাতামুহুরীর বাঁকে বাঁকে শুনতে পায়নি দোয়েল-কোয়েল-বউ কথা কও পাখির গান। কেবল দীর্ঘ ৯ মাস ব্যাপী শুনে গেছে যুদ্ধের দামামা, রাইফেল স্টেনগানের বুলেট বৃষ্টি। এভাবে বেড়ে ওঠা মানিক গণ-মানুষের অধিকারের কথা বলতে গিয়ে আত্মস্থ করেছে রাজনীতি, হাতিয়ার হিসেবে হাতে তুলে নিয়েছে প্রতিবাদী কলম। তার কলম থেকে কেবল দ্রোহের অনল বর্ষণ হয়নি, ঝরেছে প্রেমের বৃষ্টিও।

মানিকের দ্রোহে ইমিটিশনের কৃত্রিমতা নেই; তার দ্রোহ ঠুনকো কাঁচপাত্রের মতো ভঙ্গুরও নয়। এই দ্রোহ হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত। তার প্রমাণ দেখি ‘গহীনে দ্রোহ নীল’ কাব্যে। চির তারুণ্যের, চির যৌবনের, চির সবুজ বৃক্ষের মতো দ্যুতিময় হয়ে ওঠে এ কাব্যের শব্দ-সম্ভার। তার ধ্যানে-জ্ঞানে চির ভাস্বর হয়ে ওঠেছিল কলঙ্ক বিহীন এক শুভ্র জগৎ।

কিন্তু মানিক ভালো করেই জানতো চাঁদের স্নিগ্ধ-সজীব-শুভ্রতার মাঝেও কলঙ্কের কালিমা আছে। এই কলঙ্কের কালিমা অস্বীকার করাও অসম্ভব। ফলে মানিকের পক্ষে শুভ্রতার কলঙ্ক মুখস্থ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না। তারই স্বীকারোক্তি তার ‘শুভ্রতার কলঙ্ক মুখস্থ করেছি’ কাব্য।

আবার কলঙ্ক মুখস্থ করে ঘুরঘুটি অন্ধকারে নিজেকে হারিয়ে ফেলেনি মানিক। বহুরৈখিক প্রতিক্রিয়ায় তাকে হাজির হতে দেখি ‘নৈনিতালের দিন’ কাব্যে। নষ্ট সময়-সমাজ, নষ্ট রাষ্ট্র-রাজনীতি, স্বদেশ ও বৈশ্বিক মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, আশা-হতাশা, প্রেম-দ্রোহ ইত্যাদি প্রকরণ যোগে যেন এক বিশাল ক্যানভাস ‘নৈনিতালের দিন’। কিন্তু দিন তো আর বসে থাকে না। দিন চলে যায় অতীতের পাতায়। এসব অপ্রসন্ন দিনগুলোতেও মানিক মশগুল থাকে ‘শের-এ মানিক বৈরাগী’ রচনায়। মানুষ মূলত আত্মপ্রেমী, কখনো আধ্যাত্মবাদী। আবার মানুষের জীবন দর্শনে সৌন্দর্যবোধের চর্চাও চলে। সবকিছু মিলিয়ে মানিক নির্মাণ করলো এক আত্মজ দর্পণ। যেখানে শুধু নিজের প্রতিবিম্ব দেখলো না, দেখলো জীবনের রঙও।

সেই রঙের ভিড়ে কেটে গেলো মানিকের অর্ধ শতক। আজ তার ৫০তম জন্ম দিবস। দীর্ঘ লেখক জীবনে কবিতায়, গদ্যে, শিশুতোষ গল্পে ও গানে যেমন মানুষের কথা বলে গেছে, তেমনি নিজেকে নির্মাণ করেছে স্বীয় মেধা ও প্রজ্ঞায়। বাংলা সাহিত্য জগতে তার অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক এই প্রত্যাশায় তার অর্ধ শত জন্ম দিনে জানাই একগুচ্ছ রজনীগন্ধা শুভেচ্ছা।

ভিন্নতর ক্লেদজ কুসুম
মোশতাক আহমদ

“লতা কি জা‌নে কাঁটাতা‌রের বেড়া গোত্র সীমা”

অনার্য দুটি হাতের রাখিবন্ধনে অসাম্প্রদায়িক দেশ দেখবার এক অফুরান প্রার্থনা জানিয়ে কবিতার বইটা শেষ হয়েছে; যার শুরু হয়েছিল কবির আরোগ্যনিকেতনে, যেখানে তিনি স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা করতেন না বলে শুভ্রবসনা সেবিকারা নানাবিধ ভয়ভী‌তি দেখাতেন। যে কে‌বি‌ন ছফ‌া আর ইলিয়াস‌কেও বন্দী রাখ‌তে পা‌রে‌নি, ক‌বি মা‌নিক কেনইবা বশ মান‌বেন! আদতে কবি কোনোরকমের বিধিবিধানের তোয়াক্কা করেন না, এমনকি জীবনযাপনে এমনকি কবিতায় এমনকি প্রমিত বানানে।

সমুদ্র পাহাড়ের সাথে নিত্য বসবাস। হররোজ সমুদ্র পাহাড় এমনকি মেরিন ড্রাইভকেও নিত্যনতুন প্রেয়সীর মর্যাদায় আবিষ্কার করে চলেছেন এই কবি। সতীর্থ পর্যটকেরা কবির মগ্নতার কথা অবগত, তাঁর গৃহিণীর সাথে মুঠোফোনে ইতিবৃত্ত জুগিয়ে চলেন। তারপর হয়তবা চলে যান ভিন্ন কোনো পাহাড়ে।

বাঁকখালি নদি আর মনখালি সৈকত কীভাবে ধর্ষিত হয় ভূমিপুত্র ছাড়া সেই মর্মবেদনা, সেই সত্য কী বুঝবে শৌখিন পর্যটকের সানগ্লাসে ঢাকা চোখ! তাই বুঝি বা কবিতার মদ গিলেছেন আকণ্ঠ কবিজীবনটাকেই যাপন করতে চেয়েছেন জাগতিক বিবিধ জীবনের বিপরীতে কিংবা বিনিময়ে। কবিতার মদই তাঁর ভরপুর শরাবন তহুরা।এই মত্ততায় কবিতায় ইতিহাস ভূগোল সমুদয় চরিত্রদেরকে তছনছ করে ফেলেন আমূল, অসীম সাহসে- সীতার বাসরে সুতানালি সাপ আর পাহাড়পুরে রাবনের যুদ্ধ দেখতে পান, যা কী না অভাবনীয়; এবং দেখতে পান না রামকে, এই কবির কাছে এটাই স্বাভাবিক!

কবি তুলে আনেন লোকায়ত স্বর, উপাদান – মাঘের শীতে বহ্নিশিখাকে কামনা করছেন, খেজুর রসের গরম জিলাপিও সমান কাম্য- নিসর্গ ভ্রমণ সীমিত হয়ে আসে শারীরিক-বেদনা-উদ্বায়ী শীতকালে।
ধর্মশালার দুয়ার থেকে প্রতারিত হয়ে ফিরে আসেন; নাফনদির প্যারাবনের সৌন্দর্যে আকুল হন; হায়, সেই নাফও কোন বেদখলের নীলনকশায় ঢুকে যাচ্ছে! কবি জসীম উদদীন বেঁচে থাকলে ‘বালুচরে’ দেখতে পেতেন আবাসনের বিলবোর্ড। শুভ্রতাকে গিলে খাচ্ছে কলঙ্ক।

এখানে আজ ‘সত্য কাজে কেউ নয় রাজি’। আমাদের এই সমুদ্র যুবক কবির আর উপায় থাকে না শুভ্রতার কলঙ্ক মুখস্ত করা ছাড়া! শেষাবধি আমরা কী কোনো শুভ্রতার জগতে পৌঁছাতে পারি নাকি আরও গহীনে নীল দ্রোহে উদ্বেল হয়ে কবির সাথে নব্য বোদলেয়ারীয় ক্লেদজ কুসুম চয়ন করি কেবল? জানি না। উৎসাহী পাঠক কবি মানিক বৈরাগীর দ্বিতীয় কবিতার বই ‘শুভ্রতার কলঙ্ক মুখস্ত করেছি’ পড়ে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করে দেখতে পারেন।

লেখক : কবি, গদ্যকার ও অনুবাদক।

নৈনিতালের দিন পাঠোত্তর প্রতিক্রিয়া
তৌহিদুল আলম

মানব সমাজের সঙ্গে রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য-শিল্পকলার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। সমাজে রাজনীতি, অর্থনীতির যত দ্রুত পরিবর্তন ঘটে, সাহিত্যের ক্ষেত্রে তত দ্রুত হয় না। বলা চলে কবিতার বাঁকবদলের গতি আরো মন্থর। বাঁকবদলের ধারায় সামিল হয়েছেন কবি মানিক বৈরাগী। মানিক কবিতালোকে ‘গহীনে দ্রোহনীল’ কাব্যের যে বীজ বপন করেছিলেন, ‘শুভ্রতার কলঙ্ক মুখস্থ করেছি’ কাব্যে দেখি তার অঙ্কুরোদ্গম আর ‘নৈনিতালের দিন’ কাব্যে বিস্তৃত হয়েছে তার ডালপালা। প্রেম ও প্রকৃতি, নাগরিক ও রাজনীতির প্রতি তার যে আগ্রহ পূর্ববর্তী গ্রন্থে আমরা দেখেছি, এর আরও বলিষ্ঠ নিরীক্ষণ দেখি ‘নৈনিতালের দিন’ কাব্যে।
‘নৈনিতালের দিন’ মানিক বৈরাগীর তৃতীয় কবিতা গ্রন্থ। এখানে ৪টি পর্ব ভাগ আছে। মোট কবিতার সংখ্যা ৬৯টি। প্রথম পর্বের নাম ‘রোদের ভিড়ে একা’। এ পর্বে কবিতা আছে ৩০টি। মুখবন্ধ কবিতা ‘নৈনিতালের দিন’। এই নামেই কাব্যের নামকরণ।
‘নৈনিতাল’ নামের সাথে আমাদের প্রথম পরিচয় ঘটে মহাকাব্য ‘মহাভারত’ এর একটি পৌরাণিক রাজ্য হিসেবে। সেখানে আমরা দেখি রাজ্য গঠনের যে ইস্তেহার রাজা প্রদান করেছিলেন, তা আর বাস্তবায়ন করতে পারেননি অমাত্যবর্গের নৈতিক স্খলনের কারণে। স্বাধীনতা পরবর্তী বন্ধবন্ধু দেশ গঠনের যে বিপ্লব শুরু করেছিলেন তা বাস্তবায়িত না হওয়ার মূলে ছিল রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও অমাত্যবর্গের নৈতিক অধঃপতন।
‘নৈনিতালের দিন’ কাব্যনামের মধ্য দিয়েই আমরা মানিকের পুরাণ মনস্কতার পরিচয় পাই। ‘নৈনিতালের দিন’ কবিতায় অনুযোগ-অভিমান-শ্লাঘার রসায়নে কবি প্রতিক্রিয়ার মার্জিত কাব্যভাষা এবং সহজ আয়াসে তাদের উদ্দেশ্যে বলেন- “আমি বুঝে গেছি বহুকাল আগে/তুমি তোমরা আস তোমাদের প্রয়োজনে।”

কবিতার শেষ স্তবকে কবি ঐসব কুটিল মানুষদের চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন মারফতি ভাষার, যাকে প্রতীকীও বলা যায়। আসলে দেহ-মন এক না হলে সত্যিকার অর্থে তাকে মানুষ বলা যায় না। এই প্রশ্নই কবি দ্ব্যর্থহীনভাবে ছুড়ে দিয়েছেন তাদের উদ্দেশ্যে। কবির ভাষায়- “কায়া আছে ছায়া আছে/কলব গেছে কই/দেহ কলব এক না হলে/বানর গোত্র কই।”
মানিক ‘বানর গোত্র’ শব্দদ্বয় মানব জাতির প্রতীকী অর্থে ব্যবহার করেছেন, যা আমাদের বিজ্ঞানী ডারউইনের কথা মনে করিয়ে দেয়। এখানে মানিক স্বীয় অভিজ্ঞতার যে অভিযোজন ঘটিয়েছেন, তা কবিতাকে নিঃসন্দেহে সমৃদ্ধ করেছে।
যুগে যুগে আমরা দেখেছি কবিগণ প্রেমকে বিচিত্রভাবে কবিতায় চিত্রিত করেছেন। ইরানি কবি তো প্রিয়তমার চিবুকের একটি তিলের জন্য সমরকন্দ বিলিয়ে দেয়ার কথা বলেছিলেন। মহাদেব সাহাও ছিলেন প্রেমকাতর। ‘চিঠি দিও’ কবিতায় তাকে অসম্ভব কাতরগ্রস্ত হতে দেখি প্রেয়সীর চিঠি পাওয়ার জন্য। মানিকের প্রেম উচ্ছ্বাসে তেমন হিন্দোলিত হয় না। তার মধ্যে দেখতে পাই সুশীল পরিমিতবোধের প্রকাশ। তাই আষাঢ়-শ্রাবণের ধারাজল এবং বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশির সামনেও তার অধর শুকিয়ে আসে প্রিয়তমার অনুপস্থিতিতে। এই কবিতার তৃতীয় স্তবকের শব্দগুলো তাদের অঙ্গীকারের অতন্দ্র সাক্ষী বলে মনে হয়। যেমন-
“কথা ছিল মানকচু পাতার ছাতায় লুকাবো আমরা/ খালি পা, ভাঁটফুল, ঝাউবীথি, মাসির গরম পিঁয়াজু,/
মাধুরী রাখাইনের দুচোয়ানি/থুড়ি থুড়ি চিয়ার্সির পিয়ারিতে/ ঘোলাটে হবো চোখে ও মুখে”
চূড়ান্তভাবে আশায় আশায় বেড়ে উঠে কবির বিরহ, প্রেম থেকে যায় অধরা। বলা হয়ে থাকে আধুনিক কালে শিল্পের স্তব্ধতা নেই। অর্থাৎ শিল্প গতিময়। কবিতার ক্ষেত্রেও কথাটা খাটে। কেননা একযুগ থেকে অন্যযুগে ঘটে কবিতার প্রসার। যুগের ঘটনা পরম্পরাকে স্পর্শ করা, যুগসত্য ও প্রাণধর্মকে আবিষ্কার করা বা করবার চেষ্টা করা হচ্ছে কবির দায়িত্ব। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, সামাজিক অস্থিরতা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, রাজনীতির নামে মানুষের ওপর হিংসাত্মক নিষ্ঠুরতা ইত্যাদির প্রভাব কবি চৈতন্যে প্রবলভাবে নাড়া দেয়। ফলত কবি হন যুগের সাক্ষী। ‘জ্বলন’ কবিতায় মানিক তেমন একটি যুগসত্যকে তুলে ধরেছেন। অগ্নিদগ্ধে অঙ্গার হওয়া মানুষদের তিনি তুলনা করেছেন কাঠ-কয়লার স্তূপের সাথে। তাই তিনি সখিকে সতর্ক করছেন এই বলে-
“আমি সেই বিশুদ্ধ বিসুভিয়াস/পুড়িয়ে নতুন সম্ভাবনা দিই,/মানুষ স্বপ্ন দেখে মানুষ পুড়িয়ে/কাছে এসো না, পুড়ে যাবে সখি।”
এমন রাজনৈতিক অবক্ষয়ের পরও কবি ভুলে থাকেননি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের জন্মদিবস ২৫ বৈশাখের কথা। বেলা যায় ২৫ শে বৈশাখকে উপজীব্য করে দায়িত্ববান অগ্রজ কবির নির্লিপ্ততায় মানিকের চিত্তপ্রদাহের প্রকাশ ‘রজনী ও যামিনীর আলাপন’ কবিতাটি। তাই বেদনা ভারাক্রান্ত মানিকের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়ে ওঠে-
“কবিতা মঞ্চটি এখন নীরব, ঝাউয়েরা সরব/ চা খেতে খেতে কুয়াশা মিশ্রিত বাতাসের আর্দ্রতার লোবান চুষি”
কবিতার এক অপরিহার্য প্রকরণ হচ্ছে মানুষ। কবি যেমন মানুষ, তেমনি তিনি যাদের নিয়ে ভাবেন তারাও মানুষ। মানুষ আছে বলেই প্রকৃতি সুন্দর। কবি নজরুলের কণ্ঠে ছিল মানুষের জয়গান। তিনি মানুষকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে বলেছেন-‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান’। বিষ্ণু দে মানুষকে আবিষ্কার করেছেন প্রাত্যাহিক কর্মব্যস্ততায়। ‘প্রকৃতি আমি মানুষ ভালোবাসি’ কবিতায় দেখি মানিকের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। এখানে তিনি মানুষের সাথে সম্পর্ক তৈরি করেন। তিনি মানুষকে ভালোবেসে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, তারই সাবলীল স্বীকারোক্তি আছে এই কবিতায়। মানুষের আদর-স্নেহ, অভিনন্দন-শুভেচ্ছা পেয়েছেন বলেই তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন, তার কবি হয়ে ওঠার মূলে মানুষের অবদানের কথা। যেমন-
“আমি মানুষের কোন কোন অবদান অস্বীকার করব/মানুষকে ভালোবাসি, মানুষের জন্য লড়ি।”
‘রৌদ্র করোটিতে’ আমরা শামসুর রাহমানকে রৌদ্রদগ্ধ হয়ে পুরো শহর চষে বেড়াতে দেখেছি। ‘রোদের ভিড়ে একা’ কবিতায় মানিকও প্রখর রোদের ভিড়ে শহর ঘুরে নির্মাণ করেন আত্মবিরহ পুরাণ। আজকাল ভোরের হাল্কা রোদও প্রচ- তাপদাহ ছড়ায়। তিনি বিজ্ঞানের দৃষ্টান্ত টেনে বলেন, এটা জলবায়ু পরিবর্তনের কুফল। কবির ভাষায়- “প্রচ- রোদের ভিড়ে জনজটে তবুও নিঃসঙ্গতা/ আমাকে ঘিরে নির্ঘুম চোখে পাহারা লেখা মানুষের প্রয়োজনে।”
‘নৈনিতালের দিন’ কাব্যের দ্বিতীয় পর্বের নাম ‘খুন হয়ে যায় তোমার অতীত’। ৮টি কবিতা দিয়ে পর্বটি সাজানো হয়েছে। এই পর্বের প্রথম কবিতার নাম ‘পুরুষ’। আমাদের সমাজব্যবস্থা পুরুষতান্ত্রিক। মোদ্দাকথা সারা পৃথিবীতে জারি আছে পুরুষতন্ত্র। পুরুষের স্বভাবধর্ম সর্বক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তার করা। নারীর ওপরও চলে তাদের আধিপত্য। সক্রেটিস বলেছিলেন- নিজেকে জান। কিন্তু আমরা ক’জন আর নিজেকে জানি ! জানলেও তা প্রকাশ করার সৎসাহস থাকে না। কিন্তু মানিক ব্যতিক্রম। ‘মনুষ্যচারী’ কবিতায় তিনি নিজেই দিলেন তার চারিত্রিক সনদ।
‘মনুষ্যচারী’ কবিতায় আমরা যে অনুশোচনা-দগ্ধ কবিকে পাই, ‘সেই সব মানুষেরা ফিরে আসে’ কবিতায় দেখি তার বিপরীত চিত্র। এখানে কবির মধ্যে জেগে ওঠে দ্রোহ ও প্রেম। কবিতাটি বেশ দীর্ঘ। দীর্ঘ কবিতার বেলায় দেখা যায় কবি যথেষ্ট সচেতন না হলে বাঁধন আলগা হয়ে যায়। কবি নজরুলের দীর্ঘ কবিতাগুলোতেও সেই সমস্যা আছে। শামসুর রহমানের অনেক দীর্ঘ কবিতা পাঠকের কাছে ক্লান্তিকর। তবে মাইকেল মধুসূদন দত্ত এই বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। মানিকের এই কবিতাটিও পাঠ বিচারে উত্তীর্ণ এ কথা বলা যায়।
তৃতীয় পর্বের নাম ‘মৃত্যুর গান’। এই পর্বেও ৮টি কবিতা আছে। ‘সং অব ডেথ-৩’ থেকে ‘সং অব ডেথ-৬’ শিরোনামে ৪টি কবিতা আছে। কবিতাগুলোর মূল উপজীব্য মৃত্যু চিন্তা ও স্রষ্টার কাছে আত্মসমর্পণের অভিলাষ।
চতুর্থ পর্বের শিরোনাম ‘মঞ্চের অনল বর্ষণে’। এই পর্বে কবিতা ২৩টি। উক্ত নামের মধ্যেই মানিকের রাজনৈতিক মনস্কতার পরিচয় পাওয়া যায়। গ্রন্থের মলাটে ছোট্ট পরিসরে মানিকের কর্ম ও রাজনৈতিক জীবনের পরিচয় আছে।
কলাকৈবল্যবাদীদের ধারণা কবিতা ও রাজনীতির অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে। দুটিকে এক করতে গেলে কবিতা হয়ে পড়বে স্লোগান সর্বস্ব। বুদ্ধদেব বসুও ছিলেন কবিতায় রাজনীতির অনুপ্রেবেশে ঘোর বিরোধী। কিন্তু পরবর্তীতে তাদের এই ধারণা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। আমরা দেখেছি নজরুল ও সুকান্তের মধ্যে প্রখর রাজনৈতিক চেতনা। মানিকের এই ঘরানার কবিতাগুলো বেশ সমৃদ্ধ। যেমন- ‘বিশ্বায়ন’, ‘যমজ বটবৃক্ষ’,‘পথিক’ ইত্যাদি।
শব্দ হচ্ছে কবিতার প্রধান উপাদান। ইটের ওপর ইট না বসালে যেমন ইমারত হয় না, তেমনি পরিকল্পিত শব্দ-বিন্যাস ছাড়া উৎকৃষ্ট কবিতা হয় না। আধুনিক কবিতায় যতটা না ছন্দ থাকে তার চেয়ে অধিক থাকে শব্দ বিন্যাসের কলা-কৌশল। ফরাসি কবি মালার্মে বলেছেন- শব্দ হচ্ছে বক্তব্য প্রকাশের পরিসীমা। তিনি দৈনন্দিন প্রচলিত শব্দকে কবিতার উপযোগী করে ব্যবহার করেছিলেন। মানিকও সচেতনভাবে শব্দ আহরণ করেছেন মিথ, আরবি, ফার্সি, লোকজ ও প্রতিদিনের ব্যবহার থেকে। যেমন-দুচোয়ানি, কিটকট, চিয়ার্সি, নহর, মৌতাত, ধোঁই পিঠা, কুদঙ গুহা, তাড়িখোলা, ফানা, ইশকে সুফিয়ানা, লোবান, কামোষ্ণ, গোমরাহি ইত্যাদি। কবির শব্দজ্ঞান ও ব্যবহারের দক্ষতা নিঃসন্দেহে কবিতাকে সমৃদ্ধ করে, যা আমরা এই গ্রন্থে অবলোকন করেছি। উপমা-রূপকের সাবলীল প্রয়োগ এবং অক্ষরবৃত্ত ছন্দের অনুরণনে ‘নৈনিতালের দিন’ কাব্যকে সুপাঠ্য গ্রন্থের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যায়।

মানিক বৈরাগীর ‘গহীনে দ্রোহ নীল’ প্রসঙ্গে
শামসুল আরেফীন

১৪ এপ্রিল ২০১১, ০১ বৈশাখ ১৪১৮ নিজ পরিবার ও কয়েকজন আত্মীয় নিয়ে কক্সবাজার গমন করলে পূর্ব পরিচিতি কবি মানিক বৈরাগীর সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে। এ সুযোগে তার নব প্রকাশিত সর্বপ্রথম কাব্য ‘গহীনে দ্রোহ নীল’ আমার হাতে ধরিয়ে দেন। কক্সবাজার থেকে থেকে ফেরার পর অনেকদিন নানা ব্যস্ততার কারণে গ্রন্থটি পাঠ করার অবসর হয়নি। সম্প্রতি পাঠ করে একটি ব্যাপার লক্ষ্য করে মুগ্ধ হলাম। কবি হিসেবে সচেতনতার সাথে তিনি মনে রেখেছেন তার মৌলিক পরিচয় প্রথমত, তিনি নিজেেেক মনে করে দ্রাবিড়।
প্রান্তিক প্রান্তর শূন্য মোষের ডেরা
নিহত নদীর কাফনে ব্যস্ত শকুন বোবা মুখ
রাষ্ট্রসভা, ভাঙ্গা বাঁশি, উদলা রাখাল, ফিঙে দোয়েল
শূন্য চারণ
মহারাজ, কি দিয়ে সাজাই যমুনায় ফারাক্কা,
এখানে বারোমাস উদ্বাস্তু আসে জননী কারখানা
সৈকত তটে ব্যাৎসায়নের দালান গড়ে: সাগর দেখিনা
বিদ্যুৎরুপী বৃষ্টি, বিদ্যুৎ-বৃষ্টি যায় আসেনা
ব্যস্ততায় যায় দিন কিস্তি চিন্তায় চৈত্র-বৈশাখ বুঝিনা
স¤্রাট আকবর তোমাদের বাঙালি করেছে?
আমি দ্রাবিড় (অনুভবে বৈশাখ, পৃ:৪৩)
অনন্তর, নিজেকে মনে করেন জন্মসূত্রে মসুলমান পরিচয়প্রাপ্ত এমন একজন, যিনি শৈশবে বুঝে না বুঝে ধর্মীয় রীতি-নীতি পালন করলেও এখন করেন না যেহেতু ধর্মের মধ্যে দলাদলি, তরিকা-দ্বন্দ্ব, রক্তারক্তি তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন।
জন্মেই শুনেছি আযানের ধ্বনি বেড়েছি মসুলমানের ঘরে
দেখেনি মুহম্মদ দেখিনি সাহাবা আরব ভূমি।
ধরণীর আলো বাতাস শস্য মৎস্য খাদ্য যত প্রকৃতির কীর্তি।
শৈশবে ঊষালগ্নে আদুরে ঘুম ভেঙ্গে পাঞ্জেখানায় কুরআন মুখস্ত করেছি
প্রচলিত নিয়ম বুঝেনা বুঝে মসজিদে নামাজ পড়েছি।
এখন পড়িনা নামাজ করিনা ধর্ম পালন না পাই যদি প্রশ্নের উত্তর
তুমিই তো একা নিরাকার আল্লাহ মুহাম্মদই শেষ নবী,তবে কেন?
তোমার ঘরে তোমার পতাকায় খুনে রাঙ্গায় আপন ভাইয়ের হাত তরবারি তোমারি
শিয়া সুন্নি ওয়াবি তর্কদ্বন্দ্বে সংঘাতে কুহেলিয়ার নীল জল রক্তে রাঙ্গায়
বুদ্ধির বিকাশে দেখেছি জেনেছি, পাইনি ্উত্তর
পীর আসে পীর যায়, তরিকা-দ্বন্দ্ব লেগে রয় মুরীদানের গায়
শ্যামল গাঁয়ের সহজ সরল মূর্খ মানুষ কষ্টে পেট চালাই, পীর কোথা পাই।
লালন আমার সার্বজনীন সর্বজ্ঞেয় মুহাম্মদই শেস নবী
আমি-ই খোদার খোদা-ই আমার দিব্য সৃষ্টি। (সরল কথা, পৃ:২৫)

‘গহীনে দ্রেহা নীল’-এ নিজের মৌলিক পরিচয় তুলে ধরেন এবং ৪০ এর অধিক কবিতা উপস্থাপন করেন মানিক। কবিতা সমস্তে আধুনিক কবি হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। কবিতাতো শব্দের খেলা। কবিতায় শব্দ ব্যবহার প্রসঙ্গে ১৯৯৯ সালে কলকাতায় অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত ও দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘ আধুনিক কবিতার ইতিহাস’ গ্রন্থে বলা হয় ‘বাঙলা ভাষা এবং শব্দ এক নয়, ভাষার মধ্যে ধ্বনি আছে অনেকখানি জায়গাজুড়ে। তা না হলে অর্থহীন বৈদিক ¯্রােতধ্বনি ওই মর্যাদা পেতনা, ব্রজবুলির মতো আবেগ নিয়ন্ত্রিত, ব্যাকরণ বিস্মৃত ভাষা পেতাম না আমরা। আধুনিক কবিতার শব্দই সমগ্র ভাষাকে কোনার্ক কিন্নরীর চিবুকে খোদিত করে তুলে ধরেছে। অনন্ত শূন্যের দিকে মালার্মে সাদা কাগজ মেলে রেখেছিলেন, ভাষার ভাষা পরম শব্দকে অভ্যর্থনা করে নেবেন বলে।’
মানিকের কবিতায় মানভাষার শব্দের পাশাপাশি কখনে সখনো যুৎসই বা লাগসই আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ ঘটেছে। যেমন- তেদুঁরের, কৈতর, ভুনা, বাইন্যা, ধেচ্ছুয়া, ভাদাইম্যা প্রভৃতি।
স্বপ্নের কোন ্ক্রান্তিকাল নেই সে আসবেই তেঁদুরের মতো
….
তবুও তারা আসে যায় আমার জালালী কৈতুর বাক্বাকুম করে। (কুদোং গুহা, পৃ:৭)
২.
তোর প্রেমে পোড়া কলিজা ভুনা অনামিকা টুকরো
নানরুটি সাথে আমার উপাদেয় প্রাতরাস
মাংস ছিল্লা হাড়ে গহনা চুড়ি
বাইন্যা শিল্পে নতুন সংযোজন প্রেম, পৃ:১২)
বুভুক্ষ ধেচ্ছুয়া গিলে খায় স্বপ্ন সন্ধ্যা (সুবর্ণ সন্ধ্যায়, পৃ:৩৬)
আমি নষ্ট হবো বিক্রি হবো,একদা আওয়ামী ভাদাইম্যা ছিলাম (আওয়ামী ভাদাইম্যা, পৃ:৪৮)
পাহাড়ি ও আঞ্চলিক অনুষঙ্গ,এমনকি পুরাণ কথাও লক্ষ্যনীয় তার কবিতায়-
আমিও আদম সন্তান যীশুর রক্তাক্ত বুকে দেখি সবুজের ঐকতান।
জিবরাঈল আসেনা তাই স্বপ্ন দেখি কুদোং গুহায় । (কুদোং গুহা, পৃ:৭)
ফিরে চলো চিক্কপুদি
আমাদের অরণ্যে
যেখানে এখনো বন মোরগ ডাকে পেখম খুলে ময়ূর নাচে
বনফুলের বৈচিত্র শোভা পায়
সারি সারি বৃক্ষরাজি শিষ দেয় বনের পাখি
উচু নিচুগিরি পথে বন্য প্রাণীর ডাক শুনে
তোমাদের পথচলা (পাহাড়ি জনপদের মুক্তি ও একজন কল্পনা চাকমা পৃ:৮)
পূর্ণতিথিতে জোয়ার আসে হাওয়ায় হাওয়ায়
কার শিহরণ জাগে
মুহুরী পাড়ের মেয়ে, নদী ভাঙা মানুষের মিছিলে যেওনা
উত্তর পূর্বে সীতার পাহাড় (উজান গাঙে কৈ মাছের সঙ্গে, পৃ:৩৫)
দিব্যি আরাম করছে আরা’ফে আর আসবেনা বোররাক
মস্তিষ্কের মাজরা পোকা শুধুই আঁধার খোঁজে (সুবর্ণ সন্ধ্যায়, পৃ:৩৬)
নব্বইয়েই কবি হিসেবে মানিকের আত্মপ্রকাশ। তার পূর্বের অনেক আধুনিক কবির কবিতায় আঞ্চলিক শব্দও বিশেষ করে আঞ্চলিক অনুষঙ্গ রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের মতো শব্দ সচেতন কবি ‘কিনু গোয়ালার গলি’ নামক বিখ্যাত কবিতায় ‘ভুতি’ (কাঠাঁলের ভুতি) নামে আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করেন। তিরিশের শক্তিধর পাঁচ কবি বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী ও সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতায় আঞ্চলিক শব্দ খুুঁজে পাওয়া না গেলেও জীবনানন্দ দাশের কবিতায় আঞ্চলিক অনুষঙ্গ প্রবল। বলাবাহুল্য, অতিমাত্রায় শব্দ সচেতন এই পাঁচ কবি রবীন্দ্র প্রভাব বলয় থেকে মুক্তি হয়ে ভারতীয় ইতিহাস ঐতিহ্য সংস্কৃতি পুরাণ কথা পাশ্চাত্য সাহিত্য দর্শন ধারণ করে কবিতায় নিজস্ব স্টাইল সৃষ্টিতে মনোযোগী ছিলেন। তাদের পরবর্তীতে জসীম উদ্দীন, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, মোহাম্মদ রফিক, রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ প্রমুখ কবিতায় আঞ্চলিক শব্দের বা ভাষার প্রয়োগ ঘটান।
এহনবি জিন্দা আছি, এহনবি এই নাকে আহে
গোলাব ফুলের বাস, মাচার মতন চান্নি দিলে
নিরালা ঝিলিক মারে। খোওয়াবের খুব খোবসুরৎ
মাইয়া, গহীন সমুন্দর, হুন্দর পিনিস আর আসমানী হুরীর বারাত; খিড়কির রৈদ ঝুম
কাওয়ালীর তান, পৈখথ সুনগান বানায় ইয়াদে
এহনবি জিন্দা আছি, মৌতের হোগায় লাথথি দিয়া
মৌত তক সহি সালামত জিন্দা থাকবার চাই।
‘এই মাতোয়ালা রাইত’ এক ফোঁটা কেমন অনল।
শামসুর রাহমানের ‘এই মাতোয়ালা রাইতদ কবিতার এ অংশে পুরান ঢাকার অনেক আঞ্চলিক শব্দ, কিংবা বলা যেতে পারে কবিতাটি পুরোপুরি ঢাকার আঞ্চলিক ভাষাভঙ্গির।
আরো পরে আরো অনেক কবিতায় আঞ্চলিক শব্দ ও আঞ্চলিক অনুষঙ্গ নিয়ে এগিয়ে আসেন, বিশ শতকের নব্বই দশকে এগিয়ে আসেন ব্রাত্য রাইসু, সাখাওয়াত টিপু, মুজিব ইরম, শামীম রেজা, সিরাজুল হক সিরাজ, শাহিদ হাসান প্রমুখ। এ দলের সিরাজুল হক সিরাজের কবিতায় আঞ্চলিক শব্দ ও আঞ্চলিক অনুষঙ্গ দারুন উপভোগ করার মতো।
শূন্য ঊরা ঘাড়াহীন আরাইল
বাঁশের বেড়ায় নারার ছাউনি ঘর
বিন্নিধানের ডোলে ইঁদুরে কুকুর মুচুর
গজিতে নেই চাউল, ঝিমুচ্ছে
নি:সঙ্গ ডলইন
উজাড় অরণ্য খরায় শুকিয়েছে হিমছড়ি
বে-মা ঝড়ে তছনছ মাদার বইন্যা, নিদানিয়া
আরাপারা গেরস্থালী
ওর্ঘুমা সোনার পাড়ার দিয়াকুল পুঁথি মাঝি
কেউ নেই কেউ থাকেনা
স্মৃতির মান্তকে জিঁয়াতা জারাইল ফুল
বাকবাকুম বাকবাকুম (রূপচাঁদা কঙ্কাল/সিরাজুল হক সিরাজ, ২০০৯)
নব্বইয়ের মাঝামাঝি এ দলের সাথে মানিকের সংযুক্তি। তার কবিতায় আঞ্চলিক শব্দ ও আঞ্চলিক অনুষঙ্গের ব্যবহার আমাদের আশ্বস্ত করে যে, স্বদেশি অথবা আধুনিক কবি হিসেবে একদিন তার অবস্থান পাকাপোক্ত হবে।
রচনাকাল: ২০ নভেম্বর ২০১১।

লেখক: কবি ও লোকগবেষক, প্রাবন্ধিক

বই আলোচনা : শুভ্রতার কলঙ্ক মুখস্থ করেছি’ সভ্যতায় ঢাকা কদর্যের মুখোশ উন্মোচন
মামুনুর রশীদ

কবি মানিক বৈরাগী, প্রখর তারুণ্যদীপ্ত সাহসী একজন মানুষ। সাগর পাড়ে বেড়ে ওঠা মানুষটি সাগরের মাতাল ঢেউয়ের তালে নিজেকে বিকশিত করেছেন একজন মুক্তচিন্তার সাহসী মানুষরূপে। রাজনৈতিক ভাবেও তিনি সুস্থ রাজনীতিতে বিশ্বাসী। মুক্তচিন্তা আর সুস্থ রাজনীতি এই দুই মিলেই তিনি একজন কবি। তাই মানুষ, প্রকৃতি, সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম রাজনীতি এসবই তার কবিতার ভাবনার পরিধি। প্রগতিশীল ভাবনার একজন মানুষের কাছে সমাজ মানে অকৃত্রিম মিলনের সেতুবন্ধ; সংস্কৃতি মানে মননশীল চিন্তার চর্চা; ধর্ম মানে অন্তরাত্মার সাথে পরমাত্মার নিভৃত মিলন; রাজনীতি মানে একটি মহৎ আদর্শের বিকাশ। কিন্তু এই সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম রাজনীতি যখন প্রকৃত স্বরূপ থেকে বিচ্যুত হয়ে দানবীয় রূপ ধারণ করে তখন নিরীহ মানুষ হয় সেই দানবীয়তার বলী। কবির ভাবনার আকাশ তখন ঢেকে যায় নিকষ কালো মেঘে। কবি মানিক বৈরাগী যে সমাজ, সংস্কৃতি ধর্ম, রাজনীতির স্বপ্ন দেখেন, বাস্তবতার সমীকরণে সেটি পুরোটাই ভিন্ন। তিনি দেখেন বর্তমান সমাজ মানে কিছু স্বার্থেন্বেষী মানুষের ঐক্যবদ্ধ বসবাস যেখানে অবহেলিত থাকে নিরীহ সাধারণ মানুষগুলো; সংস্কৃতি মানে সারবস্তুহীন কিছু মানুষের নিরর্থক হইহুল্লুড়, ধর্ম মানে শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ আলখেল্লার আস্ফালন; রাজনীতির অন্তরালে চলে বাঘ-সিংহ আর হায়েনাদের উন্মত্ত ভোজন বিলাস। কবির ভাষায় সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম, রাজনীতি যেমন শুভ্রতার প্রতীক তেমনই এসবের নামে ভন্ডামী সেই শুভ্রতারই কলঙ্ক।

‘শুভ্রতার কলঙ্ক মুখস্থ করেছি’ রূপকাশ্রয়ী এই শিরনামে কবি মানিক বৈরাগী উন্মোচন করতে চেয়েছেন সেইসব শুভ্রতার মুখোশগুলো যার অন্তরালে রয়েছে শুধুই কদর্য বাস্তবতা। সেসবই কবি তুলে ধরেছেন কখনো তা সরল প্রকাশে, কখনো সোজা সাপটা কথায়, কখনো প্রচন্ড ব্যঙ্গ বিদ্রুপে, আবার কখনো দ্রোহের অনল বর্ষণে।

‘শুভ্রতার কলঙ্ক মুখস্থ করেছি’ কবি মানিক বৈরাগীর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ যার উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে রয়েছে দেশের অসুস্থ রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ। ছাত্রজীবন থেকেই অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ কবি স্বপ্ন দেখেছেন ৭৫ পরবর্তী ক্ষত-বিক্ষত সোনার বাংলাকে আবার বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলারূপে গড়ে তুলতে। রাজনীতি করতে গিয়ে সাম্প্রদায়িকতার হিংস্র থাবায় ক্ষত- বিক্ষত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন; কারাভোগ করেছেন বহুদিন। তবুও নিজের আদর্শ থেকে একপাও বিচ্যুত হননি বরং আরও শাণিত হয়ে এগিয়ে চলেছেন অকুতোভয়ে আলোর পথে।

দীর্ঘ সংগ্রামের পর রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলেও রাজনীতি তার স্বরূপ বদলায়নি। প্রগতিশীল রাজনীতির প্লাটফর্মে বাসা বেঁধেছে কিছু বসন্তের কোকিল। ৭১-এ যারা এদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল তারাই এখন আশ্রয় নিয়েছে প্রগতির পতাকাতলে। রাজনীতির গায়ে ধর্মের রঙ মাখিয়ে এদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের সরল অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে লুটেপুটে খাচ্ছে সবকিছু। কলুষিত করছে স্বদেশভূমি। কিন্তু স্বদেশমাতা যেন নীরব। কবির মতে স্বদেশমাতা যেন সেই পুরনো শকুনদেরই লালন পালন করছেন এই পবিত্র ভূমিতে। আর যাঁরা নিজেদের সবকিছু উজাড় করে দেশকে ভালোবেসেছেন তাঁরাই অবহেলার আস্তাকুঁড়ে পড়ে থেকে ধুঁকেধুঁকে মরছে। ‘মনসার স্বপ্ন’ একটি রাজনৈতিক কবিতা যেখানে কবি তুলে ধরেছেন বর্তমান রাজনীতির চালচিত্র চরম ব্যঙ্গ বিদ্রুপে আর হতাশায়-

“দুরভিসন্ধি করে আমাকে পুড়াও আগুনে, কাবাব করে
গণতন্ত্রের নামে ক্ষমতারোহণের পথকে কন্টকাকীর্ণ দুর্গম
প্রাত:রাশ করো, হে স্বদেশ মা মনসা
তোমার গোত্র পুত্ররা বিদেশ বিভূঁইয়ে যৌনবিলাসে
মাদক মাদুলের পথ সুগম করে আমাকে বেচোনা আর।
আমরা কি তোমার সতীনের সন্তান
বাস্তুভিটা স্বদেশ করো রাক্ষুসী জালে
মমতার পরম ছলনায় সফেদ আঁচলে পুষো বিষধর কেউটে
একাত্তরের ছোবলের ক্ষত এখনো শুকায়নি মা
ওগো মা মনসা তোমার লেলিহান জিহ্বা গোটাও
তোমাকে পুজা দিয়ে আরতি জানাই
এবার আমায় ক্ষান্ত দাও, আমাকে আগাতে দাও।”

‘আসে বসন্ত ফুল বনে’ আরো একটি চমৎকার কবিতা যেখানে খানিকটা তির্যকভাবে তুলে ধরেছেন অন্তঃসার শূণ্য রাজনীতির চালচিত্র। কবির মতে রাজনীতি চলে গেছে হঠাৎ করে গঁজিয়ে ওঠা কিছু ভুঁইফোড়, সুবিধাভোগী রাজনীতিবিদদের দখলে। কবি যাদেরকে ‘হাইব্রিড কোকিল’ নামে অভিহিত করেছেন। মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকা শরিফ, এতিমখানা সবকিছুর নামে চলে দখলবাজি। তেল গ্যাস, মৎস্য গবেষণার নামে চলে লুটপাটের রাজত্ব-

“গেলো শীতে খেজুরের ঠসঠসে তাজা রসের পিঠাপুলি উৎসবে
নতুন নতুন মাছ উৎপাদনের ঘোষণা দেয় সরকার
আমাদের মৎস্য-কৃষি মন্ত্রী দারুণ করিৎকর্মা
মিঠাপানির দীঘিতে ইলিশের প্রজনন গবেষণা চলছে
আগামী বসন্তে সমুদ্র বিজয়ের স্বাদ নিতে পরদেশী
পুঁজি প্রবাহ বাড়াতে গ্যাসকুপে ছেয়ে যাক গোটা সমুদ্র
আমাদের পাহাড়েরা সুশোভিত হবে টিলা শ্রেণিতে
প্রত্যাশিত মধুকরের প্রতীক্ষায় মাদুকরীরা
সাজবে বসন্ত বাউরিতে”

বাস্তবতার করাঘাতে জর্জরিত কবি মনের ব্যকুলতা কাটাতে বারবার ছুটে যান সবুজ অরণ্য, পাহাড়, নদী, সাগরের কাছে। প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন গুলোর মাঝে খুঁজে পান আদিম মানুষের আবেগের ভাষা ও সুখ সচ্ছন্দ্যের মুহুর্তগুলো। কিন্তু কবির প্রাণের আবেগের আশ্রয়গুলো যখন আধুনিক সভ্যতা, ধর্ম, রাজনীতির লোলুপ থাবায় ক্ষত।

লেখক : গদ্যকার ও ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক, রাজশাহী।

কবি মানিক বৈরাগীর আত্মকথার ভাষিক উচ্চারণ “শুভ্রতার কলঙ্ক মুখস্ত করেছি”
আজিজ কাজল

একটা সময় মানুষ তার আত্মপরিচয়ের মুখোমুখি দাঁড়ায়। হতে পারে নতুন উদ্ভাবনে। নতুন আবিষ্কারে। এভাবে বিহহ্বল ছন্দে জেগে ওঠে যার হাতে; ভাটি বাংলার সরল সাংস্কৃতিক উচ্চারণে। পরম্পরা ভেদে যেখানে আছে আঞ্চলিকতার সৌরভ। ছাইচাপা আগুনের মতো মাঝে মধ্যে কুহলী আবার অনবদ্য সাহসী; নিজের আঞ্চলিক উচ্চারণের অভিধাটি মাথায় রেখেই কবি হতে চাইছেন যেনো,একটি ভূগোলের– কালের কথক ও সাহসী প্রত্যয়-পথযাত্রী। যদিও এই পথ, এতো কোমল আর মসৃণ নয়। একই ভূগোলে, বাংলার বহু জনপদের মতো এমন বহু উল্লাস, উচ্চারণ আর নৃপতি ধ্বনিও মিশে আছে, এই বাংলার আকাশ বাতাসে। এভাবে আমরাও দেখতে পাই,সীমাহীন জয়যাত্রার প্রত্যয়দীপ্ত আবার কিছুটা ভঙ্গুর যাত্রার শতো শতো প্রতিধ্বনি। কবি মানিক বৈরাগী আমাদের একটি প্রশ্নের মোচড় ঠিকই লাগিয়ে দিতে চাইছেন। কিছু একটা ভাষিক উচ্চারণ বা উত্তুঙ্গ আওয়াজ তিনি তুলতে চাইছেন। কাব্যগ্রন্থের অনেক কবিতায়–কিছুটা সরাসরি দেখা আবার অনুভবের কল্পনায়,নন্দনে, আঞ্চলিক ভাষিকতার কিছু অনুষঙ্গ ইশারা আর প্রতিধ্বনি আছে। আমরাও দেখতে চাই, এই করে করে কবি কতোটুকু বিচরণ করেন, আমাদের বাংলা কবিতার মূল ভোমরায়, এবং নিজেকে আরো কতোটুকু ছাড়িয়ে যেতে চান আত্মধ্বনির প্রাবল্যে- রক্তিম সাহসে। “মনখালী”- /শৈল-সাগর মিতালী সড়কে যেতে যেতে নগ্নমুরায়/ /সাগরের উদাসী আহবানে খসে পড়ে/ শাড়ি ব্লাউজ পেটিকোট হিমছড়ি-রেজু-ইনানীর পাহাড়…/ কবিতায় পাহাড়ি জনপদের মানুষের বিচিত্র যাপন আর প্রকৃতির দুর্লভ কিছু বিষয় তার নিজের মতো করে, কবিতাটি অনন্য প্রয়াসী হয়ে ওঠে; মন খালীর রুপবতীর তঞ্চগ্যা রমণীর ফলজ মদের অনবদ্য বয়ান ভঙ্গীতে। সুতরাং মনখালী হয়ে যায় এখানে- একটি দেশের, আরো পার্বত্য বা পাহাড়ী জীবনের বৈচিত্র বা সুরের নুপুরগাথা প্রতিধ্বনি… “আষাঢ়ের মন ঝরে তুমুল প্রতাপে”– /কে কার মন ছুঁয়েছিল সেদিন? না তুমি না আমি/ মনের জানালা ঠাস ঠাস খুলে যায়/ /এমনি ঘন ঘোর বরষা’…/ কবিতায়, তুমুল উচ্চারণে দেখি, প্লাবনে ভেসে যাওয়া বা ভেঙে যাওয়া মানুষের আবাস বা স্বপ্নের আঘাত লাগা আষাঢ়ের তুমুল চিতায় মানুষ নীড় হারা হয়… কিংবা আদিবাসী তরুণীও জানে জুমের অঙ্কুরে কী যাতনা…এই একটি বাক্যেও আমরা কিছু মানুষের স্বপ্ন আর মরমের রোদন কেমন হতে পারে, কবিতায় অন্যমেজাজে সেটিরও অবিচল সুর প্রতিধ্বনিত হতে দেখি “মাৎস্যগন্ধ্যা সুখ” /…প্যারাঘাসে খেতজুরাফল খোড়ে খায় মানবিকতা…/ বা /প্রজননহীন অজুখানায় শ্যাওলা হয়ে বাঁচে…/ বিষয় গুলো আমার কাছে নতুন মনে হয়…এখানে খেছুরাফল শব্দটা যদিও কিছুটা ধাক্কা দেয়; তবে নতুন অনবদ্য আঞ্চলিক শব্দ সংযুক্তিও মনে হয়… কবি নুরুল হুদাকে উৎসর্গ করা কবিতাটিতে, সাগরের ঢেউ আর লবণের মিতালীও নানা অনুষঙ্গের মরমে গাথা, যেখানে উপকূলীয় স্বরের সহজাত ভাষাও আছে… “শরাবন তহুরা” কবিতায়- কবি স্র্বগীয় সোধার অনবদ্য বিশ্বাসকে মাথায় রেখে, কবি এক বস্তু সুখের অমিত পানে যেনো সদা ব্যপৃত। কোন ভনিতা নেই; নেই অতি উচ্চারণ বা ধ্যানস্থ পাখির মৌন। কবি তার সহজাত সরল বচনে আমাদের শুনিয়ে যান আত্মকণ্ঠের নির্মল নিসর্গ বয়ান। যেখানে পাহাড়ী জনপদের মানুষ আর প্রকৃতি মিশে গেছে একই পয়ারে… “কৈলাস বোধন” কবিতায় আছে, অন্যরকম আঁচড়। বাংলা সাহিত্যের আরেক কিংবদন্তী-কবি ওমর আলীকে উৎসর্গ করা কবিতায় শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি…কবিও যেনো সেই উল্লাস আর রুপের সুভাসে নিজেও ভেজাতে চাইছেন নিজ কবিতার আলোক ধ্যান। এই করে কৈলাশ বা বড়ো কোন মহা শক্তির নতুন স্বরে গাইতে চেয়েছেন কবিতার নতুন জয়গান; ছুটে যেতে চেয়েছেন অসাম্প্রদায়িক বোধনে মা দুগা দুগা বলে। এখানে আছে কবির অসাম্প্রদায়িক চেতনা; এবং দেখতে পাই নিজেকে বিশেষ কোন বাতাবরণে বা ধর্ম পরিচয়ে আলাদা না করে,মানুষকে বড়ো করে দেখার এক সুমহান শক্তির উৎস। “কুরবান” কবিতায় কবি হৃদয়ের শক্তিকে দিতে চেয়েছেন নতুন মহিমা- শোনিতে বেদ ত্রিপিটক/ বাম হাতে বাইবেল ডানহাতে কুরআন/ মগজে মনসুর হাল্লাজ…/ কুরআন,ত্রিপিটকের মতো অধ্যাত্ম নয়, মসনবীর মতো কোন আধাত্ম্য শক্তির বাণীও তার কাছে অতো বড়ো বা মহৎ নয়। যেখানে আছে হৃদয় নামে নতুন বিবেকী শক্তির আরাধ্য। মানুষের হৃদকমলেও যে আছে সেই শাস্ত্রের বসবাস। শাস্ত্রের অনবদ্য আরেক বিকল্প রোশনাই যে, হৃদয় হতে পারে- সেটিও ইঙ্গিতে, বিশেষ করে নতুন ব্যঞ্জনায় কোমল হয়ে ওঠতে দেখি আমরা…. “অনার্য বৈশাখ”- /… বৈশাখে ভেসে যাবে সাম্প্রদায়িক ভেদরেখা/ অনার্য দুটি হাত রাখি বাঁধে অফুরান প্রার্থনায়…/ আমাদের শক্তিশালী অনার্য পরিচয়ের জায়গাটি যে নানা শৌর্য বীর্যে মহিয়ান; কবির অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সেটি হয়ে ওঠেছে আরো গাঢ় এবং আত্মসংকটের বিপরীতে দারুণ অভিঘাত। এভাবে “মনসার স্বপ্ন”, “প্লাটুনিক সঙ্গম”, কাঁদে নাফ, কাঁদে জল”, “বসন্ত আরোহন”, “অন্তর পুড়ে নৈ:শব্দ্য” এবং “আজনবী খুন” সহ আছে, ভিন্ন নামের উপস্থাপন ব্যঞ্জনার আরো কিছু কবিতা। যে কবিতার অনেকগুলোতে, বিশেষ ব্যক্তিকে স্মরণ বা উৎসর্গে নিজের দায়মোচন বলে মনে হয়েছে; এবং অগ্রজের প্রতি বিনীত বা তার দুর্লভ-বিশেষ শ্রদ্ধার প্রকাশটিও পস্ট হয়েছে। এভাবে কবি, নিজের দেশ, ভূগোল এবং বিশেষ করে নিজের আত্মআঞ্চলিক জায়গাটিতেও নিজের দার্শনিক বা অনুভূতির আনুপূর্বিক প্রতীতির– সোজা কথার মধ্য দিয়ে অনবদ্য সাহসে স্পষ্ট করতে চান। কবিতায় কিছু সরাসরি আঞ্চলিক শব্দ, কবিতার গঠন শৈলিকে আর উপস্থাপনাকে, নান্দনিকভাবে কিছুটা শৈতিল্য করেছে বলে মনে হলো। উপস্থাপনার ভাষা যদি এই সময় চেতনায়, আরো নিরেট কিছু শিল্প-ভাষাময় এবং শব্দ-বাক্য বুননে করা যেতো– হয়তো সেই শৈতিল্য আরো দারুণ করে উতরে যাবার সম্ভাবনা ছিলো। এরপরও বলতে হয় “শুভ্রতার কলঙ্ক মুখস্ত করেছি” কাব্যগ্রন্থের অনেক কবিতায়, সেই উত্তরণ চিহ্নের লক্ষণযোগ্য কিছু আভাষকে আমরা বাদ দিতে পারিনা….কবির কলঙ্ক তিলক তার অনবদ্য শিল্পের কলঙ্ক নিয়ে, সম্ভাব্য নব-সাহসের বলিষ্ট উচ্চারণে, আরো ধীর ও ধীমান হবে ।

মানিক বৈরাগী’র একগুচ্ছ  কবিতা

বাঙালি নারীবাদ ও সিমন দ্য বোভোয়ার

সন্ধ্যার ক্যাফে বসে অথবা শীততাপ নিয়ন্ত্রিত
সম্মেলন কক্ষে গোলটেবিলে
কথার খৈ ফোটে মেদবহুল রমণীর ঠোঁটে।

সুরার পেয়ালা নেচে ওঠে সাকির সুরে
আদিবাসী মনবন জেগে ওঠে সাংগ্রেইংয়ে
জোসনা রাতে আহত ম্যান্ডোলিনে সুর তুলে নীলকণ্ঠের কবি
পূর্বরাতে মেঘের সুরভি মেখে বৃষ্টিরেণু মুঠোপুরে
বজ্রপাতের উৎস খুঁজি
কবিতার খেরোখাতায় বিগত প্রেমিকারা নারী না মানুষ?
বৃষ্টি ভেজা বুকে ভোদকার উষ্ণতায় মস্তিষ্কের অনুরণনে
সিমন দ্য বোভোয়ার সুখছবি আঁকি।

নারিকেল জিঞ্জিরা থেকে সেন্টমার্টিন

প্রায় নদীর কাছে যেতাম রকে বসে গল্প হতো দু’জনে,
নদীর ঢেউয়ে জলের অতলে দেখি মীনের সংসার।
স্বপ্ন বুনি আগাম, অমনি বৃষ্টিহীন আচমকা বন্যার জোয়ার
স্রোতের টানে আমরা ভেসে গেলাম
রোদেলা শাড়িতে সে ডুবতে থাকলো,
স্রোতের বিপরীত সাঁতারে শাড়ি-ব্লাউজ-শার্ট-জিন্স-কেডস
সব খুলে আসীম আবেগে আদিম দু’জন।

কেয়া বনে নাফের চরে যখন ঘুম ভাঙলো
জোসনা ছিল আকাশে, আমরা আকাশ দেখলাম
জোসনায় কেয়ার সুরভি মেখে পাথুরে চরটি আমাদের হলো।
উলুখাগড়ার বেড়া,কেয়ার খুঁটি,
কাশফুলের ছাউনি ছোট্ট একটা কুটির আমাদের
প্রাগৈতিহাসিক সংসার।

এখানে নীল পদ্মপুকুর, মিষ্টি জল,
পুকুরপাড়ে জোড়া নারকেল গাছ
সাগরের লোনা হাওয়া,
ঢেউয়ের গর্জন পুকুরে সাগরে ডুব সাতারে
খিদে পেলে নারকেল তলায় বসে শালুক খেতাম।
বাইন গাছের ছায়ায় কেওড়া ফুলে
প্রজাতির উড়াউড়ি দেখতে দেখতে শুয়ে থাকি
সাগর মেখলা সঙ্গমে।

এমনি সময়ে ডিক্রি নিয়ে শ্বেতাঙ্গ এক নাবিক এলো,
আমরা হা করে তাকিয়ে রইলাম
হাত ও মুখের ইশারায় বললো ছেড়ে দিতে হবে স্বপ্নচর,
পাখিরা বিদ্রোহ করলো
নাবিক বাজ আঁকা পতাকা ওড়ালো
খুঁটি পুতলো আমাদের উদোম বুকে।
পিস্তল উঁচিয়ে শ্যেন দৃষ্টি ফেলে ডিক্রি জারি করে, ৎ
এখানে বিলাসী প্রাসাদ হবে।
দলবেঁধে আসবে মানুষ জমবে মেলা শীতে,
শৈবাল-নুড়ি-পাথর-কাছিম-শ্যাওলা
প্রেয়সীর প্রিয় উপহার
সেই থেকে স্বপ্নচর নারিকেল জিঞ্জিরা ভোগের আঁধার।

প্রেম

ইটখোলার চুল্লিতে পুড়ে খাক হ
আমি দিব্যি করিব সংসার

তোর বালতি ভরা অশ্রুজলে
আমি করিব স্নান

তোর সুন্দর চোখ তুলে মার্বেল করে
বানাব কানফুল, দেখবে লোকে ব্যতিক্রম

তোর প্রেমে পোড়া কলিজা ভুনা অনামিকা টুকরো
নানরুটি সাথে আমার উপাদেয় প্রাতরাশ

মাংস ছিল্লা হাড়ে গহনা-চুড়ি
বাইন্যা শিল্পে নতুন সংযোজন

তোর অকাল দেবদাস-প্রয়াণে লিখিব এলিজি

তোর সমাধিতে রোপিব দেবদারু
বিরহ ‘লালন’ রুশ্নি ছড়াবে মালবিকা।

মহিনের কন্যারা

ঢেউ জড়ানো পাতাদের সুরভী ছড়ানো
ঝাউয়ের গান শুনি
তীরে বসে উচ্ছল ঢেউয়ে বৃষ্টির খেলায় মুগ্ধ থাকি
মরুর ক্যাকটাস ফলের সাথে কাঁঠাল রসের
যৌগ রসায়নে উত্তপ্ত বুদ্বুদ বাজনা শুনি
জল জোসনায় ধীরলয়ে আসে জলপরি
আমি অপার হয়ে ছলচ্ছল হাসি শুনি।

তুমি কি দেখতে পাও সখি অদৃশ্যের দৃশ্য?
তুমি কি শুনতে পাও জলদেবের মেঘরাগ?
কখনো কি পান করেছ? অমৃতের ফলজ শরাব
নৃত্য করি না একা, গাই না কোনো গান একা
আমরা যে সমবেত সুফিয়ানা, ইসকে দিওয়ানা
আমাদের দেহ থাকে, কলব লুটে ঊর্ধ্বলোক
আরাফ আরসে মহিনের ঘোড়া ছুটে আসে মর্ত্যলোকে
সেই ‘ভেজা মেঘের দুপুরে’ মাহিনের কন্যারা
আর্তনাদের আদর্শ খেয়ে বাঁচে।

চিয়ার্স: অধরা অধরে নহর শুকায়

কত দিন
শ্রাবণের ভেজা সৈকতে ভিজি না
কিটকট চৌকিতে বসে বসে ইলিশ ভাজা সাথে দুচোয়ানির চিয়ার্স
শুধু একটি চুমোর অভাবে
হলো না

আষাঢ় গেলো, শ্রাবণ যায় যায়
জলধিকে সাক্ষ্য রেখে মুক্ত সৈকতে
অধীর আকাঙ্ক্ষায়
অধর শুকিয়ে যায়
কেউ নাই কেউ নাই
কেউ কাউকে কি চায়?

কথা ছিল মানকচু ছাতায় লুকাবে আমায়?
খালি পা, ভাঁটফুল, ঝাউবিথী
মাসির গরম পিয়াজু,
মাধুরি রাখাইনের দুচোয়ানি
থুড়ি থুড়ি চিয়ার্সির পিয়ারিতে
ঘোলাটে হবো চোখে ও মুখে

অধর শুকিয়ে যায়
আশায় আশায়
হলোনা হলোনা

তাবত দুনিয়া তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবো বলে
ভালোবাসার চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দেবো বলে
অধরা অধরে নহর শুকিয়ে যায়।

আষাঢ়ের মন ঝরে তুমুল প্রতাপে

কে কার মন ছুঁয়েছিল সেদিন?
না তুমি, না আমি
মনের জানালা ঠাস ঠাস খুলে যায়
‘এমনি ঘনঘোর বরষায়’

টিনের চাল বস্তির শিশু কাকের বাসা বোঝে
আষাঢ়ের একগুঁইয়ে প্রতাপের মর্মফল আর আমি
প্লাবনে ভেঙেছে বেড়িবাঁধ ঝিরিতে খরস্রোত
আদিবাসী তরুণী জানে জুমের অঙ্কুরে কী যাতনা

ঐ শৃঙ্গটি আর কতকাল বইবে তোমার অবসর স্মৃতি
এখনো একটি শেকড় ঠেস দিয়ে ঠেকিয়ে রেখেছে ধস

‘তুমি চলে এসো এক বরষায়’
এখন কোথায় মন ঘোর বর্ষায়।

শুভ্র পরীর শাসন

সাদা সাদা অ্যাপ্রোন জড়িয়ে আসে পরীর দল
মনরাঙা শুভ্র হাসি দেয় সুঁই হাতে
পরীক্ষার নামে কঠিন কোমলে সিরিঞ্জ ভরে
শুষে নেয় খুন।

ধবধবে সাদা পরীরা পথ্য দেয় যথানিয়মে
চোখ রাঙানো শাসন–তামাকের গন্ধ কেন?
আংকেল জানেন এটা হাসপাতাল?
এখানে ওসব চলবে না, ডাক্তারদের বলে দেবো
সাতশত এক নম্বর কেবিনে যায় না ঢোকা তামাকের গন্ধে।

আহমদ ছফা, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকেও শাসিয়েছ শুভ্র পরীরা
জয়াকে হাত করে ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে তারা
আমি ভাবি, এমন কঠিন কোমলের শাসন
কৈশোরে পেতাম শব্দ নিয়ে খেলা হতো না আর
তখন আমি হতেম রাষ্ট্রযন্ত্রের দাস।

ছাইস্বর্ণ অম্লজলে

ঈশ্বর সবাই দেখি লুটে পড়ে চেটেপুটে চাটছে
লুটিয়ে লুটতে চাটতে পারি না খাসলত গুণে।

দিয়েছ নুরের আগুন, শিখা তো ঊর্ধগামী উদ্বায়ী।
ব্রজপাত বর্ষণে ভেঙেছি বারবার, মচকাতে পারি না,
লুটাতে শিখিনি পিচ্ছিল এ নরাধামে,
পিছলে যাই বারবার, সুপ্ততায় গুপ্ত হয়েছি,
রেহায় মেলেনি তবু ছাইস্বর্ণ ভেবে অম্লজলে
জ্বালিয়ে জারণ করে ছেঁকেছে কড়াইয়ে।

অতপর জেনেছি
তুমি ও মানুষের এমনি স্বভাব।

জ্বলে বুকের স্বদেশ

সম্মোহন বিদ্যায় তাদের পারদর্শিতায়,
তুমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পান করেছ খ্যাতির শরাব। ঝলকের ঝিলিকে
বাসনার জলে–জালে জ্বলে রূপের নহর।

ক্লান্তির অবসাদে টলে পা,
ঝাঁজালো টক টক লোবানে মুখোরিত বাতাস
শ্বাস নিই বিষাদের।

মাকড়সার ইন্দ্রজালে পোকা মাকড় আটকে গেলে
যেমন করে, তোমাদের মগজেও
কিলবিল করছে বিশ্বায়নের মোহান্ধ আকাঙ্ক্ষা। তাই
তুমিও ইউরোপ আমেরিকার ইন্দ্রতান্ত্রিক আসক্তিতে উন্মাদ।

বাংলাদেশের ধড়িবাজ ফটকাবাজ দুর্নীতিবাজেরা এখন কানাডায়,
সুশীল সোসাইটির পৌরহিত্যের আসনে বসার প্রতিযোগিতায় নেমেছে তারা।
উড়ো খবর আসে ঠিকই,
তোমার নাকি চারণ ক্ষেত্র তাদের মদ মাদুলির মাদুরে।
মোহ মোহরের ইন্দ্রজালিক বাসনায়,
কোনো কোনো জল জলসায় রূপের রোশ্নাই জ্বেলে জ্বালাও বুকের স্বদেশ।

নিঃসঙ্গ জোছনার মায়া।

সূর্যের আলো ঠিকরে পড়ছে ধবধবে সাদা অন্ধকারে
রাস্তা ঘাট জলমহাল লক্ষ্যারচরের বিলসহ বিরান ভূমি
কোথাও কেউ নেই সুনসান ভুতুড়ে নীরবতা চারদিক
ক’দিন থেকে শুনিনি প্রতিদিনের কাকের ডাক
কর্কশ স্বরে ডাকা কাকও অনির্দিষ্টকালের জন্য ডেকেছে ধর্মঘট
আমাদের বাড়ির উঠোনের গাছে যে পাখিরা আসতো তারাও নাই
ঠিকই চাঁদ ওঠে জোছনা বিলোয়, জোছনায় আসতো মনসার কন্যারা
এই ভরা পূর্ণিমা তিথিকে মনেহয় মরাকাটালের জোয়ার হল্লা দিয়ে আসে
পাড়াকে মনেহয় ভূতগ্রাম ঘরগুলোকে মনেহয় ভুতুড়ে বাড়ি শব্দ শুনি
কোথাও কোনো মানুষ দেখি না
আমি জানালায় বসে আকাশ দেখি।

যিশুর বুক

হেই দুনিয়া তোমার রাজ্যে কখনোই মানুষ হয়ে জন্মাতে চাইনি
মানুষ তো হাবিল কাবিলের জাত তাই মানুষের মাঝে রক্তপাত

হে মানুষ তোমরা কি কখনো দেখেছো উদ্ভিদ উদ্ভিদের করেছে ক্ষতি
হে মানুষ তোমরা কি কখনো দেখেছো গোলাপ কতৃক গন্ধরাজের ক্ষতি
হে মানুষ তোমরা কি কখনো দেখেছো বাঘ সিংহ খাবার মজুদ করতে
হে মানুষ তোমরা কি কখনো চিন্তা করেছো বিনাবাক্যে কাকের উপকার
হে মানুষ তোমরা কি কখনো দেখেছো উড়ন্ত শকুন কে মানুষ খুন করতে

আমি যুদ্ধবিধ্বস্ত বিংশ শতকে মানুষ রূপে জন্মাতে চাইনি
পিতা মাতার অন্তিম বিনোদনের সর্বকনিষ্ঠ হাবিল কাবিলের জাত
প্রভুর কাছে প্রার্থনয় বলেছি , অন্তত অর্জুন গাছ করে যেনো পাঠায়
মহাপ্রভু আমার কথা রাখেনি,আমাকে হাবিল কাবিলের উত্তরাধিকার করলো

হে মহাপ্রভু জীবনের অর্ধশতকের প্রারম্ভিকে তাকিয়ে দেখি পেরেক বিদ্ধ জিশুর বুক।

কবি’র জন্মহাট
নাসের ভূট্টো

কৌমুদী ভেজা আলোছায়ার পোড়া মাঠে
আন্দোলিত পাঁপড়িগুলো রেখেছি জমা,
মাঝে মাঝে ছুঁয়ে দেখি- কবি’র জন্মহাটে
শুভেচ্ছা জানাবো! যদি পাই তুমুল ক্ষমা।

হৃদয়ের মোড়ে নিভে যাওয়া মুগ্ধ-মোহনা
বিন্দুর ভিতর সিন্ধু খোঁজে উদাসীন…….
আজ সেই সব প্রণয়কালের প্লাবন যাতনা
অনার্য আভায় ডাক পাড়ে শুভ জন্মদিন।

আকাশে ফুলের দাগ
কালাম আজাদ

মানুষ মনে হয় ধরেই নেয় যে অন্তত ১০০ বছর বেঁচে থাকবে। তাই ৫০ বছর পূর্ণ হলে অর্ধেক জীবন পার হওয়ার একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে রক্তে। কেমন একটা অনুরণন তৈরি হয় শরীরে। রোম দাঁড়িয়ে যায়। ফলে নিজেকে শজারুর মতো লাগে যেন এইসব রোমের কাঁটায় বেষ্টনি গেড়ে কাটিয়ে দেবে আরো ৫০ বছর।

না, আমার ৫০ বছর হয় নাই। হয়েছে মানিকভাইয়ের। আমি অনুমান করছি মানিকভাইয়ের এমনই কোনো অনুভূতি হচ্ছে এই দিনে। যদিও তাকে আমি গত ৫ বছর ধরে প্রায় সময় বলে আসছি আপনি আর মাত্র বছর তিনেক বাঁচবেন।

মানিকভাই মানে কবি মানিক বৈরাগী। তাকে মানিক বৈরাগী নামে চিনি আমি বছর দশেক হলো। এর আগে মাঝখানে অনেকদিন কোনো খবর জানতাম না। কোথায় গেলেন, কী করছেন কিছুই জানতাম। নানা কাজে ও অকাজে একপ্রকার ভুলেই গিয়েছিলাম, তাই খোঁজও করিনি।

মানিকভাইকে আমি ছোটবেলায় চিনতাম সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক নামে। ১৯৮৮ সাল থেকে চিনি। সেই হিশেবে তাকে চিনি ৩২/৩৩ বছর তো হবেই। তিনি আমার মেজআপার বন্ধু ছিলেন কলেজে। আমাদের বাড়িতে আসতেন মাঝে মধ্যে, হাতে থাকতে লালবই। কবিতা পড়তেন। তার বাড়ি আর আমাদের বাড়ির মাঝখানে একটা নদী ছিলো, নদীর নাম মাতামুহুরী। নদী এখনো আছে শুধু দুইকূলে আমাদের বাড়ি নেই।

কলেজে মানিকভাই ছাত্র ইউনিয়ন করতেন। নেতা ছিলেন। আর করতেন খেলাঘর আসর। খেলাঘর আসরে আমিও মনে হয় কয়েকবার গিয়েছি মানিকভাইয়ের সঙ্গে। তখন আমার ৮/৯ বছর বয়স। সব স্মৃতি আজ ধোঁয়াশা হয়ে গেছে।

উদীচীর কার্যক্রমের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন মানিকভাই। নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র আন্দোলন, জননী জাহানারা ইমামের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির হয়ে মুক্তিযোদ্ধা ছাত্র কমান্ডের দায়িত্ব গ্রহণ ও স্বাধীনতা বিরোধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন করেছেন।

পরে মানিকভাইয়ের মুখেই শুনেছি কলেজ পাশ করে ১৯৯১ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ছাত্র শিবিরের ক্যাডাররা ধরে নিয়ে গিয়ে তার ডান পায়ের রগ কেটে দেয়।

তারপর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে রাজনৈতিক হয়রানির উদ্দেশে পুলিশ রিমান্ড, জেল ও বহু মামলার আসামী করা হয় তাকে। রিমান্ডে নির্যাতনের ফলে স্পাইনাল কর্ডে আঘাত পেয়ে এখন কী অবস্থা তা আর বলতে মন করছে না।

এত সব ঘটনার মাঝে কখন যে শ্রেণিহীন সমাজের স্বপ্নে বিভোর সেই বিপ্লবী সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক হয়ে গেলেন পুরোদমে কবি মানিক বৈরাগী, তা হয়ত তিনি নিজেও বুঝতে পারেননি।

শৈশবে মানিকভাই ছিলো আমার চর্মচক্ষুতে দেখা প্রথম প্রথম স্মার্ট এবং সুদর্শন মানুষ। উজ্জ্বল রঙের হাফশার্ট পরতেন। প্যান্টের সঙ্গে ইন করা থাকতো। এখনো সেই দৃশ্য চোখে ভাসে।

আজ ২৮ জানুয়ারি। মানিকভাই অর্ধেক জীবনে এলেন। ১৯৭১ সালের এই দিনে আমার জন্মের ১০ বছর আগে তিনি জন্মেছিলেন। শুভ জন্মদিন, প্রিয় মানিকভাই। অনেক ভালোবাসা।

-কবি ও গবেষক

কবির প্রতি শ্রদ্ধা
পলাশ দাশ

কালের বিচারে যারা বেঁচে আছেন তারা কোন না কোন ভাবে ত্যাগী ও প্রেমী ছিলেন, তাই রবীন্দ্রনাথের ভাষায় যে নিজেকে ভুলিতে পারে তাকে এ পৃথিবী ভুলে না, কবি মানিক বৈরাগী ও তেমন একজন মানুষ, এ সমাজের নিবেদিত প্রাণের নাম।
একজন আপাদমস্তক প্রগতিশীল ও প্রতিবাদী কবি। ছাত্রজীবন থেকে মুজিবাদর্শে আপোষহীন, স্বচ্ছ ও স্পষ্টবাদী রাজনীতি করে এসেছেন, সমাজ পরিবর্তনে অগ্রণী ভুমিকা রেখে চলেছেন আজো, যার জন্য তাঁকে জীবনে অনেক মূল্যও দিতে হয়েছে। মূলত কবিতা লেখা তার যেহেতু পেশা ও নেশা, তাই নিজের জীবন বাজি রেখে কক্সবাজার সমাজে আজো কবিতায়, বক্তৃতায়, কথামালায় বিভিন্ন পর্যায়ে মুখোর থাকেন। কবিতা, প্রবন্ধ ও শিশুতোষ নিয়ে তার বেশ কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে এবং পাঠক নন্দিত হয়েছেন। তিনি তারঁ লিখুনীতে সমসাময়িক, ইতিহাস ঐতিহ্য, সমাজের গোড়ামি,ন্যায়নীতি তুলে আনলেও, সে নিভৃতে প্রকৃতি ও সৌন্দর্য প্রেমিও বটে।
আজ কবি’র জন্মদিন, জন্মদিনে কবির প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসা ও আন্তরিক শুভেচ্ছা।

-তরুণ কবি।

Please Share This Post in Your Social Media

ে ি মতামত

  1. মানিক বৈরাগী বলেছেন:

    ধন্যবাদ ভালোবাসা কৃতজ্ঞতা
    প্রিয় সম্পাদক জসিম আজাদ ও dbdnews24.com

  2. মুহাম্মদ সাজ্জাদ হোসাইন বলেছেন:

    শুভ জন্মদিন, কক্সবাজারের কবি ও বৈপ্লবিক ব্যাক্তি।
    ধন্যবাদ bdnews24.com.
    এই মহান কবির সুবর্ণ জয়ন্তীতে বিশেষ ক্রোড়পত্রের মাধ্যমে কবিকে গভীরভাবে জানবার সুযোগ করে দিয়েছেন বলে

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

More News Of This Category
© 2018 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | dbdnews24.com
Site Customized By NewsTech.Com