1. azadzashim@gmail.com : বিডিবিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম :
  2. litonsaikat@gmail.com : neelsaikat :

উদ্ভট গাধার পিঠে চলেছে স্বদেশ

  • Update Time : সোমবার, ১ জুলাই, ২০১৯
  • ২৬ Time View

।।সুরঞ্জন আহমেদ।।

দীর্ঘ আট বছর পর নাসির উদ্দিন ইউসুফের তৃতীয় চলচ্চিত্র ‘আলফা’ মুক্তি পেয়েছে। চট্টগ্রাম থিয়েটার ইন্সটিটিউটে সিনেমা শুরু করার আগমুহূর্তে বাচ্চু ভাই কয়েকটি কথা বলেছেন। সংক্ষেপে বললে,
সমকালীন রুঢ় বাস্তবতা নির্দেশক উক্তি, ‘এখন সময়টা ভালো না’। এই নির্মম সময়ের চলমানতায় নিরীক্ষাধর্মী সিনেমা হচ্ছে, ‘আলফা’।

কর্পোরেট বাণিজ্য, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, মৌলবাদের উত্থান, ব্লগার হত্যা, শ্রেণিসংগ্রাম, শিল্পের সাম্প্রদায়িক ব্যবহার—শিল্পকে সেকটেরিয়ান গণ্ডিতে আবদ্ধ করা, গুম, খুন, ক্রসফায়ার, চোরাচালান, মাদক, জঙ্গিবাদ, আন্দোলনের নামে মানুষ পুড়িয়ে মারা, শ্রমিকদের অসহায় মৃত্যু এসবের মাধ্যমে পরিচালক আমাদের একটা কঠিন, নির্মম, পীড়াদায়ক জার্নিতে নিয়ে যায়।
নিত্যকার জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত এবং অনিত্যদিনের দ্বন্দ্ব-বিরোধ। জীবন আর রাজনৈতিক বাস্তবতা। গলি-রাজপথ-রাজনীতি—রাষ্ট্র-প্রশাসন; সবকিছুই আলফা’র ঘটনা প্রবাহে আসে আর যায়, জগদ্দল হয়ে চেপে থাকে মনে-মননে ।

আমি মুক্ত হতে চাই অথবা মুক্ত করতে চাই—এমন একটা টেনশন, ঘোর যেমন আর্টিস্টকে তাড়িত করে, ‘আলফা’ দেখতে দেখতে আমরাও এই ঘোর থেকে, টেনশন থেকে বের হতে পারি না।
‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, এখন সময় পক্ষে না’—র মতো। কিন্তু আমাদের পালানোর জায়গা নেই। না পারি পালাতে, না পারি এসব থামাতে।

বলার এই ভঙ্গিটা অনেকটা কন্সপিরেসি থিউরি আওড়াচ্ছি—র মতো হয়ে যাচ্ছে। সিনেমাটা ধ্বংসবাদী চেতনায় গড়ে উঠেছে কি না—এমন একটা পাঠ তৈরি হতে পারে। কিন্তু আমাদের যাপনই এমন। আমাদের যাপনরে বর্ণনা করলে কন্সপিরেসি থিউরি আওড়ানোর মতো লাগে।

আর্টিস্টরে প্রথমে বর্তমান সময়ের ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদের একটি উপাদান ভেবেছিলাম। ঝিলের জলে ভ্রাম্যমাণ কুঁড়েঘর। এইটার জানালা দিয়ে দেখা যায় ঝিলের প’রে গড়ে উঠা বড়ো বড়ো দালান—নগরসভ্যতা!
ইনডিভিজুয়ালজমের সময়কালে থার্ড জেন্ডার কালির আশ্রয়ে বেড়ে উঠা পিতৃ-মাতৃ পরিচয়হীন শিশু, আর্টিস্টের সাথে কালি, শিশু এবং আর আর লোকজনদের সম্পর্ক, এদের সবার মাঝে পারস্পরিক মেলবন্ধন—এসবের মাধ্যমে ধীরে ধীরে চিন্তার পরিবর্তন ঘটে।

আলফা একটা গ্র্যান্ড ন্যারেটিভের আলাদা আলাদা কিম্বা প্রত্যেকটা ঘটনার, উপাদানের সম্পর্কিত কিছু চিত্র। আমরা যে বহুমাত্রিক একটা সাংস্কৃতিক বলয়ের মধ্যে বাস করি, সেটা এই সিনেমায় পেইন্টিংয়ের কোলাজ আকারে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে । সিনেমাটিতে মোটাদাগে কোনো গল্প নেই। আলফা’কে কিউবিক ফর্মের চলচ্চিত্র বলা যায়। মানে গল্পটাকে ছড়িয়ে দেওয়া। মিলিয়ে নেবার মুক্ত-স্বাধীনতা দর্শকের। আর মেলানোর জন্য কষ্ট করতে হয়না। এসব আমাদের জীবন, নিত্যকার ঘটনাপ্রবাহ, চালচিত্র। নিয়ত বহন করে চলি। কষ্টগুলো পোষে রাখি। ঘটনাগুলো যেহেতু আমরা নিয়ত দেখি, ঘটনাপ্রবাহ যেহেতু আমাদেরই সেহেতু দ্বন্দ্বটা ঘটনার না হয়ে বোধের হয়ে ওঠে।

রুঢ় বাস্তবতা দেখে একজন শিল্পীর মনোজগতে কী তোলপাড় চলছে সেটা ক্যানভাসে রঙ ছিটিয়ে দিয়ে তাতে বিক্ষুব্ধ ও যন্ত্রণাকাতর আর্টিস্টের পারফর্মিং আর্টের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছে। পারফর্মিং আর্টের এমন পারফেক্ট ব্যবহার—সিনেমাকে সার্থক করে তুলেছে।

সনাতন গল্প, ক্লাইমেক্স, ড্রামা, থ্রিলার—এসব ‘আলফা’তে নেই। গল্পের আবহটা সুররিয়ালিস্টিক। অতীত কিম্বা ভবিষ্যৎ বর্তমানের মধ্যেই মিশে আছে। তথাকথিত ফ্যাশব্যাকের মতো না। শুধু সুররিয়ালিস্টিক’ই শেষকথা নয়। কখনও মনে হবে এক্সপ্রেশনিস্ট কখনও হয়ে উঠেছে আপাদমস্তক রিয়েলিস্টিক।
এক লাইনে বললে, অ্যান্টি-ন্যারেটিভ স্টাইলের ফ্র্যাগমেন্টেশনাল ছবি। এইরকম ছবি বাংলাদেশে আগে হয় নাই।
প্রতীক আর চিহ্নের ব্যবহার প্রচুর। দেখা শেষে দর্শকের একটা সেলুলয়েড কবিতা পাঠের তৃপ্তি আসে।

যান্ত্রিক ঢাকা শহরের রাস্তায় গাধার পিঠে শিল্পের সম্ভার নিয়ে মোজার্টের সঙ্গীতের কাছে পৌঁছানো, মোজার্টকে সাথে নিয়ে আবার নগর(অ)সভ্যতায় এক বোহেমিয়ান আর্টিস্টের হাঁটা—এসবের মাধ্যমে আমরা ক্রমশ চলে যাই একজন শিল্পীর অন্তর্জগতে। গাধার পিঠে চিরায়ত বাংলার শিল্পের সম্ভার নিয়ে যাচ্ছে এমন একজনের কাছে যিনি প্রকৃত আর্ট বুঝেন না, কিম্বা বুঝতে চান না।
আবার অভির মতো বললে, ‘আলফা’ গাধার পিঠে পরিচয়হীন লাশটি বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল নাকি পরিচয়ের আবরণে বেড়ে উঠা পরিচয়হীন সমাজকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল দূরে কোথাও ভাসিয়ে দিতে?

এই রুপক গাধাকে দিয়ে পরিচালক আমাদের কী বুঝাইতে চান সেটা আমরা বুঝি নিশ্চয়ই।

‘আলফা’কে একবাক্যে সংজ্ঞায়িত করলে নাসির উদ্দিন ইউসুফের মতোই বলতে হয়, ‘নষ্ঠ সভ্যতার যন্ত্রনাক্লিষ্ট মানবের আত্মচিৎকার অথবা শৈল্পিক প্রতিবাদের নাম আলফা।’

দেশীয় চলচ্চিত্রের ধারায় ‘আলফা’ একটি নতুন সংযোজন। আশা রাখি, ‘আলফা’র মাধ্যমে আমাদের চলচ্চিত্র ভাবনার ধারাবাহিকতায় আমাদের চলচ্চিত্র আরো ঋদ্ধ হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

More News Of This Category
© 2018 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | dbdnews24.com
Site Customized By NewsTech.Com